ম্যাচের আগে কেপ ভার্দের প্রেসিডেন্ট হোসে মারিয়া নেভেস বুক চিতিয়ে বলেছিলেন, 'ফুটবল মাঠে পরিসংখ্যান বা বড় নাম কোনো ম্যাটার করে না।' প্রেসিডেন্টের সেই বিশ্বাসের মর্যাদা দিতে মিয়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে যেন এক অতিমানবীয় রূপকথা লেখার মঞ্চ সাজিয়েছিলেন দলটির ৪০ বছর বয়সী অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনহা। তার মনে লুকিয়ে ছিল এক বিশাল স্বপ্ন—ম্যাচটি টাইব্রেকারে নিয়ে যাবেন এবং সেখানে বিশ্বসেরা লিওনেল মেসির পেনাল্টি আটকে দিয়ে কেপ ভার্দেকে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জয়টি উপহার দেবেন।
টাইব্রেকারে মেসির পেনাল্টি সেভ করে দলকে জেতানোর সেই ঐতিহাসিক স্বপ্নটি ম্যাচের ১১১ মিনিটে এক দুর্ভাগ্যজনক আত্মঘাতী গোলে ভেঙে গেছে ঠিকই, কিন্তু পুরো ১২০ মিনিটের স্নায়ুযুদ্ধে বিশ্বসেরা মেসির চার-চারটি নিশ্চিত গোল যেভাবে রুখে দিয়েছেন এই বুড়ো বাজপাখি, তা ফুটবলবিশ্ব চিরকাল মনে রাখবে। ৩-২ ব্যবধানে আর্জেন্টিনা ম্যাচ জিতলেও, ম্যাচের আসল নায়ক হিসেবে কোটি ভক্তের হৃদয় জিতে নিয়েছেন ভোজিনহাই।
ম্যাচের প্রথমভাগে মেসির রেকর্ড ২০তম বিশ্বকাপ গোলে আর্জেন্টিনা এগিয়ে গেলেও, দ্বিতীয়ার্ধে কেপ ভার্দে সমতায় ফেরার পর রুখে দাঁড়ান ভোজিনহা। ম্যাচের শেষ ৬০ মিনিটে লিওনেল মেসি বনাম ভোজিনহার যে দ্বৈরথ দেখল বিশ্ব, তা ছিল অবিশ্বাস্য:
- ৬৩ মিনিটের 'পয়েন্ট-ব্ল্যাঙ্ক' সেভ: ডি-বক্সের ভেতর বল পেয়ে ডান পায়ে বুলেট গতির শট নিয়েছিলেন মেসি। ভোজিনহা চিতার গতিতে নিজের লাইন ছেড়ে সামনে এগিয়ে এসে নিজের শরীর দিয়ে সেই নিশ্চিত গোল প্রতিহত করেন।
- ৭৩ মিনিটের শূন্যে ওড়া ফ্রি-কিক: মেসির নেওয়া ট্রেডমার্ক বাঁকানো ফ্রি-কিকটি পোস্টের ডান কোণ দিয়ে জালে জড়ানো প্রায় নিশ্চিত ছিল। ভোজিনহা বাজপাখির মতো শূন্যে ভেসে আঙুলের ডগা দিয়ে বলটি লাইনের বাইরে ঠেলে দেন।
- ইনজুরি টাইমের চতুর ফ্রি-কিক: যোগ করা সময়ে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা যখন দেয়াল তৈরি করছিল, মেসি সবাইকে বোকা বানিয়ে নিচু ফ্রি-কিক মারেন। একঝাঁক খেলোয়াড়ের পায়ের ফাঁক গলে আসা বলটি শেষ মুহূর্তে দেখেও হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে গ্রিপ করেন ভোজিনহা।
- অতিরিক্ত সময়ের পেনাল্টি বক্স সেভ: অতিরিক্ত সময়ের প্রথম ১৫ মিনিটের শেষভাগে ডিফ্লেক্টেড বল ধরে ডি-বক্সের ঠিক ওপর থেকে মেসি জোরালো শট নেন। এবার ভোজিনহা তার বাম দিকে দুর্দান্ত ডাইভ দিয়ে পাঞ্চ করে বল বাইরে পাঠিয়ে দেন।
ভোজিনহার স্বপ্ন ছিল ম্যাচটি টাইব্রেকারে নেওয়ার। সেখানে যেতে পারলে বিশ্বমঞ্চে পেনাল্টি শুটআউটে মেসির শট ঠেকানোর যে স্বপ্ন তিনি বুনেছিলেন, তা হয়তো সত্যি হতেও পারত। কিন্তু ১১১ মিনিটে মেসির কর্নার থেকে ক্রিশ্চিয়ান রোমেরোর হেড ঠেকাতে গিয়ে কেপ ভার্দের ডিফেন্ডার বার্গেসের আত্মঘাতী গোলে সেই স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়।
ম্যাচ হারলেও ভোজিনহা আজ বিশ্বজয়ী। এই বিশ্বকাপে তার অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সের জেরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইনস্টাগ্রামে রাতারাতি তার ফলোয়ার সংখ্যা হু হু করে বেড়ে ১ কোটি ৭০ লাখ (১৭ মিলিয়ন) ছাড়িয়ে গেছে! টাইব্রেকারে যাওয়ার স্বপ্ন ভাঙলেও, পুরো ম্যাচে মহাতারকা মেসিকে যেভাবে তিনি বোতলবন্দি করে রেখেছিলেন, তাতে বিশ্বকাপ ইতিহাসের পাতায় ৪০ বছর বয়সী এই গোলরক্ষকের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
'প্রচুর ভুল ছিল, আমাদের শুধরাতে হবে,' আত্মসমালোচনায় মেসি