নতুন অর্থবছরের শুরু থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল ধাপে ধাপে কার্যকর করার ঘোষণা থাকলেও এখনো এ বিষয়ে বহুল প্রতীক্ষিত গেজেট প্রকাশ হয়নি। ফলে নতুন বেতন কাঠামো কবে কার্যকর হবে, কোন গ্রেডে কত বেতন বাড়বে এবং বাস্তবায়নের ধরন কী হবে- এসব প্রশ্ন ঘিরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও আলোচনা চলছে।
সরকারি সূত্র বলছে, নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে পর্যালোচনার কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। গেজেট প্রকাশের আগে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও আইনি বিষয় যাচাই করা হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কোন গ্রেডে কত বেতন বাড়বে, সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত প্রকাশ করা হয়নি।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় রেখেই সরকার নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেবে।
তিনি বলেন, নির্বাচনি ইশতেহারে সময়মতো বাস্তবায়নের কথা উল্লেখ ছিল এবং সে অনুযায়ী বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয়েছে। তবে গেজেট প্রকাশের নির্দিষ্ট সময় জানাতে না চাইলেও তিনি বলেন, নতুন পে-স্কেল একবারে নয়, ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম ধাপে মূল বেতন বা বেসিক বৃদ্ধি করা হবে।
তবে কোন গ্রেডে কত বেতন বাড়বে, সে বিষয়ে এখনই কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তিনি। তার ভাষ্য, সরকার পর্যালোচনা ও রাজনৈতিক দিকনির্দেশনার ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর নতুন বেতন কাঠামো পর্যালোচনার জন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ইতোমধ্যে একটি খসড়া রূপরেখা প্রস্তুত করেছে এবং সেই ভিত্তিতেই গেজেট তৈরির কাজ এগিয়ে চলছে।
এখন বেতন কত বাড়ানো হবে, কত ধাপে বেতন-ভাতা সমন্বয় করা হবে এবং মূল্যস্ফীতির প্রভাব কীভাবে বিবেচনায় নেওয়া হবে- এসব বিষয় নিয়ে বিশ্লেষণ চলছে বলে জানা গেছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নতুন অর্থবছরের শুরু থেকেই নতুন বেতন কার্যকর করার পরিকল্পনা থাকলেও গেজেট প্রকাশের আগে এ বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়। প্রশাসনিক আদেশ, গেজেট প্রকাশ এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষ হতে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
তবে তিনি জানান, নতুন কাঠামো কার্যকর হলে বকেয়াসহ বেতন-ভাতা পরিশোধের বিষয়টিও সরকারের আলোচনায় রয়েছে।
অন্যদিকে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা ও অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিন পর সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামো পুনর্বিবেচনা সময়ের দাবি। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও বাজেট সক্ষমতাও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
বাংলাদেশে সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণা করা হয়েছিল ২০১৫ সালে। এরপর প্রতি বছর মূল বেতনে ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট যোগ হলেও নতুন কোনো পে-স্কেল কার্যকর হয়নি। ফলে প্রায় এক দশক ধরে নতুন বেতন কাঠামোর অপেক্ষায় রয়েছেন সরকারি চাকরিজীবীরা।
এর আগে ২০২৫ সালে সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় বেতন কমিশন, ২০২৫ সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। ওই প্রতিবেদনে সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছিল।
কমিশনের প্রস্তাবে সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়। পাশাপাশি বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশে উন্নীত করা এবং ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত যাতায়াত ভাতায়ও বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।
তৎকালীন কমিশন জানিয়েছিল, গত এক দশকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন বিবেচনায় রেখেই এসব সুপারিশ করা হয়েছে। তবে পুরো প্রস্তাব বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে, যা জাতীয় বাজেটের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সরকারি কর্মচারীরা প্রায় ১১ বছর ধরে একই বেতন কাঠামোয় বেতন-ভাতা পাচ্ছেন। এ সময়ে মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাই আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় পর্যালোচনা শেষ হলে চলতি মাসের মাঝামাঝি বা শেষ নাগাদ নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ হতে পারে। তবে এ বিষয়ে সরকারিভাবে এখনো কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হয়নি।