পেলের দেশে ফুটবল আছে, উন্মাদনা নেই, নতুন প্রজন্মের চোখ ভিডিও গেইমে!

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৬, ১২:০৮ এএম

ব্রাজিলকে আমরা দূর থেকে যেমন দেখি, কাছ থেকে সে তেমন নয়। দূর থেকে মনে হয়, রাস্তায় নামলেই বল গড়াচ্ছে। খালি পায়ে বাচ্চারা পেলের নাম ধরে দৌড়াচ্ছে। দেয়ালে নেইমার, দোকানে রোনালদিনহো, বাসে রোনালদো। কিন্তু বেলেম থেকে রিও ডি জেনেরিওর পথে, দীর্ঘ বাসযাত্রায়, সেই পুরোনো ছবির গায়ে উল্টোটাই দেখতে পেলাম। ফুটবল আছে। কিন্তু আগের মতো ক্রেজ নেই।

যাত্রা বিরতিতে বেলেমের এক চায়ের দোকানে প্রথম কথাটা বলেছিল ইগোর। বয়স বাইশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। কানে ইয়ারবাড, হাতে মোবাইল।

ফুটবলের কথা তুলতেই সে হেসে বলল,আমাদের বাবারা ফুটবল নিয়ে ঝগড়া করত। আমরা এখন গেমিং, টিকটক, এনবিএ, এমএমএ সব দেখি। ফুটবলও দেখি, কিন্তু জীবন-মরণ করে না। কথাটা শুনে মনে হলো, ব্রাজিলের ফুটবল মরেনি। শুধু সিংহাসন ভাগ হয়ে গেছে।

এক সময় ব্রাজিলে সপ্তাহান্ত মানেই ম্যাচ। পাড়া মানেই ক্লাব। বাড়িতে খাওয়ার টেবিলে রাজনীতি বাদ, ফুটবল বাধ্যতামূলক। এখন সেই টেবিলে মোবাইল ঢুকে পড়েছে। ইউটিউব ঢুকেছে। স্ট্রিমিং ঢুকেছে। ২০২৬ বিশ্বকাপেও ব্রাজিলে টিভির পাশাপাশি ইউটিউব-ভিত্তিক কনটেন্ট প্ল্যাটফর্ম বড় দর্শক টানছে এটাই প্রমাণ করে নতুন প্রজন্ম ফুটবল ছাড়েনি, কিন্তু দেখার অভ্যাস বদলে ফেলেছে। মাঠ থেকে পর্দায়, পর্দা থেকে ছোট পর্দায়, ছোট পর্দা থেকে শর্ট ভিডিওতে; খেলাটার দৈর্ঘ্য যেন কমে যাচ্ছে।
রিওর পথে এক যাত্রাবিরতিতে আলাপ হলো মার্সেলোর সঙ্গে। পেশায় ডেলিভারি রাইডার। আগে ফ্লামেঙ্গোর ম্যাচ দেখতে স্টেডিয়ামে যেতেন। এখন যান না।

`টিকিট, যাতায়াত, খাবার সব মেলালে এক ম্যাচ মানে পুরো সপ্তাহের হিসাব নষ্ট’ বললেন তিনি। ‘টিভিতে দেখি। না হলে হাইলাইটস। আবেগ পেটে ভাত দেয় না।'

মার্সেলো কথাটা বলেই লজ্জা পেলেন। যেন ফুটবলের বিরুদ্ধে কথা বলা পাপ। কিন্তু পাপ নয়, বাস্তব। জীবনযাত্রার খরচ, কাজের চাপ, যানজট, অনিশ্চয়তা এসব মিলিয়ে ব্রাজিলিয়ানদের সময় কমে গেছে। ফুটবল সময় চায়। নব্বই মিনিটের খেলা, তার আগে-পরে উত্তেজনা, তর্ক, পথ, ভিড়। তরুণেরা এখন দ্রুত আনন্দ চায়। এক মিনিটে গোল, ত্রিশ সেকেন্ডে ড্রিবল, দশ সেকেন্ডে মিম।

সাও পাওলোর বাস টার্মিনালে দেখা হয়েছিল লুইজার সঙ্গে। বয়স উনিশ। ব্রাজিলের জার্সি পরা, কিন্তু ফুটবলে আগ্রহ কম।
‘জার্সিটা সুন্দর বলে পরেছি,’ বলল সে। “নেইমারকে চিনি, ভিনিসিয়ুসকে চিনি। কিন্তু পুরো ম্যাচ বসে দেখি না। আমার বাবা পারেন, আমি পারি না।’ এই একটি বাক্যে প্রজন্মের দূরত্ব ধরা পড়ে। বাবারা ম্যাচ দেখেন। সন্তানেরা মুহূর্ত দেখে।
কেন এমনটা হচ্ছে?

অনেকের সঙ্গে কথা বলে যা বোঝা গেল- ব্রাজিলের ফুটবল-আবেগে বড় আঘাত এসেছিল ২০১৪ সালে। ঘরের মাঠে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলের পরাজয়। ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ইতিহাসে সেই রাত এখনও ‘মিনেইরাজো’ নামে দগদগে ক্ষত। তারপর ২০১৮, ২০২২ বিশ্বকাপ এল, আশা এল, শিরোপা এল না। ২০০২ সালের পর ব্রাজিল আর বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়নি। একটি পুরো প্রজন্ম ব্রাজিলকে কাপ হাতে দেখেনি।

বেলেমের এক বর্ষিয়ান আন্তোনিও বললেন, আমরা পেলে দেখেছি, রোমারিও দেখেছি, রোনালদো দেখেছি। ছেলেমেয়েরা শুধু গল্প শুনেছে। গল্প দিয়ে কতদিন আগুন জ্বলে?' তারপর একটু চুপ করে বললেন, `হারলে কষ্ট হয়। বারবার হারলে মানুষ সাবধান হয়ে ভালোবাসে।'

কথাটা অদ্ভুত। কিন্তু সত্যি। ব্রাজিল এখন ফুটবলকে ভালোবাসে, তবে বুক খুলে নয়; একটু সাবধানে।

আরেকটি কারণ স্থানীয় ক্লাব ফুটবলারের সংকট। ইউরোপীয় ফুটবলের ঝলক এখন ব্রাজিলের ঘরে ঘরে ঢুকে গেছে। তরুণেরা রিয়াল মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, ম্যানচেস্টার সিটি চেনে। নিজের শহরের ক্লাবের ইতিহাস জানে না। ব্রাজিলের প্রতিভারা খুব তাড়াতাড়ি ইউরোপে চলে যায়। ফলে স্থানীয় মাঠে তারকার অভাব তৈরি হয়।

রিওর দোকানি কার্লা বললেন, ‘আমরা খেলোয়ার তৈরি করি, ইউরোপ তাদের দিয়ে কামাই করে। এখানে জার্সি পড়ে থাকে, মানুষ পড়ে থাকে, কিন্তু খেলোয়ার চলে যায়।’

তবু সব শেষ হয়ে গেছে এ কথা বলা ঠিক হবে না। ব্রাজিলে ফুটবল এখনও জাতীয় পরিচয়ের বড় অংশ। দেশটি পাঁচবার বিশ্বকাপ জিতেছে, ফুটবল এখনও তার সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। শুধু আগের মতো একক রাজত্ব নেই।
এখন ফুটবলের পাশে দাঁড়িয়েছে স্ক্রিন, গেমিং, বাস্কেটবল, মার্শাল আর্ট, সোশ্যাল মিডিয়া, বেটিং, স্ট্রিমিং। আগে ফুটবল ছিল রবিবারের ‘মুভি অব দ্য উইক। এখন সে বহু অ্যাপের ভিড়ে এক হারানো ‘প্রিন্স অব পার্শিয়া’

শেষ রাতে বাস যখন রিওর দিকে নামছে, জানালার বাইরে আলো ফুটছিল। পাশের সিটে এক কিশোর মোবাইলে ফুটবল হাইলাইটস দেখছিল। পুরো ম্যাচ নয়, শুধু গোল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, “ব্রাজিল ভালোবাসো?”
সে মাথা নাড়ল।

`ম্যাচ দেখো?' সে বলল, “সব না। কিন্তু বড় ম্যাচ হলে দেখি।' তার নাম রাফায়েল। একটু ভেবে বলল,
`ফুটবল এখনও আমাদের। শুধু আমরা আগের মতো সারাদিন তার জন্য বসে থাকি না।'

এই হলো নতুন ব্রাজিল। ফুটবলকে ছাড়েনি, কিন্তু ফুটবলের কাছে পুরো জীবন বন্ধকও রাখেনি। গ্যালারির আগুন কিছুটা কমেছে, কিন্তু ছাইয়ের নিচে উষ্ণতা আছে। একদিন যদি আবার হলুদ জার্সি বিশ্বকাপ হাতে তুলে ধরে, কে জানে এই নীরব দেশ আবার রাস্তায় নেমে নাচবে কিনা।

ব্রাজিলের ফুটবল-উন্মাদনা তাই নিভে যায়নি। শুধু বদলে গেছে তার ভাষা। আগে ছিল ঢাকঢোল। এখন নোটিফিকেশন। আগে ছিল গ্যালারি। এখন স্ক্রিন। আগে ছিল চিৎকার। এখন কখনও শুধু একটুখানি তাকানো। তারপর আঙুল দিয়ে স্ক্রল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত