রাইভালের দেশেই রাজার মুকুট!

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৬, ১২:১৩ এএম

চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আর্জেন্টিনা। ফুটবলের মাঠে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা মানেই টান, উত্তেজনা, বুকধড়ফড়। তবু সেই ব্রাজিলের মাটিতেই লিওনেল মেসির নাম আজ অদ্ভুত এক মমতায় উচ্চারিত হয়। পাড়া, কফিশপ, বাসস্ট্যান্ড—যেখানেই ফুটবল উঠেছে, সেখানেই মেসি এসে বসেছেন আলাপের মাঝখানে।

বেলেম থেকে রিও ডি জেনেরিও—প্রায় তিন হাজার তিনশ কিলোমিটার। পকেটে চৈত্র মাসের খড়খড়া। তাই বিমানের স্বপ্ন ভাঁজ করে বাসেই উঠলাম। ৭৮ ঘণ্টার যাত্রা, ভাড়া বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২২ হাজার।

পাশের আসনে ইভানেট সুয়োজা। সাও পাওলোতে জন্ম, পেশায় সমাজকর্মী। গুয়ানার এক এতিমখানার দায়িত্বে আছেন। জানালার বাইরে দীর্ঘ রাস্তা, ছোট পেট্রলপাম্প, মাঝেমধ্যে থেমে থাকা ট্রাক। ফুটবলের প্রসঙ্গ তুলতেই তিনি হাত নেড়ে বললেন, ‘ফুটবল আমার খুব পছন্দ নয়। আবেগের খেলা বলে কখনও কখনও বিরক্তিও লাগে।’ কিন্তু মোবাইলে মেসির ছবি দেখাতেই মুখে অন্য আলো। ‘কিন্তু মেসিকে আমি ভীষণ পছন্দ করি।’

ইভানেট জানালেন, এতিমখানার কয়েকজন শিশুর ঘরে মেসির ছবি টাঙানো। তারা ব্রাজিলের জার্সি পরে, কিন্তু মেসির ড্রিবল দেখলে চুপ করে যায়।

‘ওদের একজন একদিন আমাকে বলেছিল, মেসি রাগ করে না, তাই ও ভালো মানুষ। শিশুরা অনেক সময় বড়দের চেয়েও ঠিক বিচার করে।’

ইভানেটের উত্তর সহজ, অথচ গভীর— ‘মেসি মাঠের শত্রুতা ভেঙে মানুষের মনে জায়গা করে নিয়েছেন। ব্রাজিলিয়ানরা প্রতিপক্ষকেও সম্মান দিতে জানে, যদি তিনি সত্যিই বড় শিল্পী হন।’

যাত্রাবিরতিতে এক ছোট্ট রেস্তোরাঁয় আলাপ হলো কয়েকজনের সঙ্গে। কাচের শোকেসে পাউরুটি, পাশে কফির গন্ধ। দেয়ালে পেলের ছবি। তার নিচেই ছোট্ট এক মেসি-স্টিকার। দোকানির ভাষায়, ‘পেলে আমাদের রাজা। মেসি অন্য দেশের। কিন্তু ফুটবলের সৌন্দর্য তো পাসপোর্ট দেখে না।’

বেলেমের কপ৩০ সম্মেলনের স্বেচ্ছাসেবক পেরেইরা বললেন, ‘মেসির প্রতিভা তো আছেই। কিন্তু ব্রাজিলিয়ানরা তাঁকে ভালোবাসে তাঁর শৃঙ্খলা আর বিনয়ের জন্য।’

পেরেইরা হাসতে হাসতে একটা ঘটনা বললেন। কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালের দিন তিনি ছিলেন বন্ধুদের সঙ্গে। সবাই ব্রাজিল সমর্থক। তবু ম্যাচ শেষে যখন মেসি কাপ তুললেন, ঘরের মধ্যে কেউ বিদ্রুপ করেনি। কয়েক সেকেন্ড নীরবতা ছিল। তারপর একজন বলেছিল, ‘লোকটা পেয়ে গেল। পাওনাটা পেয়ে গেল।’

এই অনুভূতি শুধু পেরেইরার ঘরের গল্প নয়। ২০২২ বিশ্বকাপের সময় ব্রাজিলের অনেক সমর্থক প্রকাশ্যে বলেছিলেন, ব্রাজিল বাদ পড়ার পর তাঁরা মেসির জন্য আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করছেন। কেউ কেউ নিজেদের ‘নির্লজ্জ’ বলেও মজা করেছিলেন। তাঁদের যুক্তি ছিল একটাই—মেসির মতো খেলোয়াড়ের হাতে বিশ্বকাপ মানায়।

গুয়ানাবারা বাস টার্মিনালে ইদুয়ানির সঙ্গে দেখা। হাতে ছোট ব্যাগ, কানে হেডফোন। জানতে চাইলাম, ব্রাজিলিয়ান হয়েও মেসিকে এত ভালোবাসেন কেন?

তিনি হেডফোন খুলে বললেন, ‘আর্জেন্টিনা আমাদের প্রতিদ্বন্দ্বী, কিন্তু মেসি শুধু আর্জেন্টিনার নন। তিনি ফুটবলের।’

ইদুয়ানির বাবা ছিলেন রোমারিওর ভক্ত। ছেলে নেইমারের। আর তিনি নিজে মেসিকে ভালোবাসেন। একই ঘরে তিন প্রজন্মের তিন নায়ক। ‘ফুটবল এমনই,’ বললেন তিনি, ‘একই টেবিলে ঝগড়াও বসে, শ্রদ্ধাও বসে।’

মেসিকে নিয়ে ব্রাজিলে আরেক গল্প খুব চলে—রোনালদিনহোর গল্প। বার্সেলোনায় তরুণ মেসির প্রথম দিনগুলোতে রোনালদিনহো তাঁকে আগলে রেখেছিলেন। ব্রাজিলিয়ানরা এই সম্পর্ককে খুব আবেগ দিয়ে দেখে। তাঁদের কাছে রোনালদিনহো শুধু ব্রাজিলের শিল্পী নন, মেসির উত্থানেরও এক নীরব সহযাত্রী। তাই অনেক ব্রাজিলিয়ান বলেন, “মেসির ভেতরে আর্জেন্টিনা আছে, কিন্তু তাঁর গল্পে ব্রাজিলেরও একটু রঙ লেগে আছে।’

নতুন প্রজন্মের ব্রাজিলিয়ান ছাত্র লুকাসের মন্তব্য আরও সরল— ‘আমি ব্রাজিলকে সমর্থন করি। কিন্তু মেসি বল পেলে মনে হয় ফুটবল একটু সুন্দর হয়ে গেল।’

লুকাসের সঙ্গে দেখা হয়েছিল এক বাসস্টপে। হাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাগ, টি-শার্টে ব্রাজিলের ছোট পতাকা। সে বলল, ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে নেইমার দেখত, এখন ইউটিউবে মেসির পুরোনো খেলা দেখে। ‘মেসি তাড়াহুড়ো করেন না। মনে হয়, তিনি আগে থেকেই জানেন বল কোথায় যাবে।’

মেসির শৈশবের গল্পও ব্রাজিলে অনেকের মুখে শোনা যায়। ছোটবেলায় তাঁর শরীরে গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি ধরা পড়ে। চিকিৎসার খরচ ছিল ভারী। পরিবার চাপে পড়ে। পরে বার্সেলোনা তাঁর চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়। এই গল্প শুনে ব্রাজিলের অনেক বাবা-মা বলেন, ‘ছেলেটা শুধু প্রতিভা নিয়ে বড় হয়নি; লড়াই নিয়ে বড় হয়েছে।’ সেই লড়াইয়ের গল্পই তাঁকে ব্রাজিলের সাধারণ মানুষের কাছে আরও মানবিক করে তোলে।

রিওর এক দোকানি মারিয়া বললেন, ‘নেইমার আমাদের আবেগ, কিন্তু মেসি আমাদের শ্রদ্ধা। দুটো জিনিস আলাদা।’
মারিয়ার দোকানে ব্রাজিলের জার্সির পাশে আর্জেন্টিনার জার্সিও ঝুলছে। জিজ্ঞেস করতেই বললেন, আগে আর্জেন্টিনার জার্সি কম বিক্রি হতো। এখন তরুণেরা মেসির নাম লেখা জার্সি খোঁজে। ‘কেউ কেউ লজ্জা পেয়ে ধীরে বলে—মেসি আছে? আমি বলি, আছে, লুকিয়ে কিনতে হবে না।’

সাও পাওলোর ট্যাক্সিচালক রদ্রিগো বললেন, ‘ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ম্যাচে আমি ব্রাজিল চাই। কিন্তু মেসির খেলা দেখলে হাততালি আটকে রাখা কঠিন।’

রদ্রিগো জানালেন, একবার গাড়িতে দুই যাত্রী উঠেছিলেন—একজন ব্রাজিলিয়ান, অন্যজন আর্জেন্টাইন। শুরুতে তর্ক, পরে মেসি নিয়ে দুজনেই একমত। রদ্রিগো হাসলেন, ‘গাড়ির ভেতর তখন মনে হচ্ছিল, সীমান্তটা একটু নরম হয়ে গেছে।’

বেলেমের তরুণী আনা বললেন, ‘মেসি প্রতিপক্ষের হলেও অহংকার করেন না। এটাই তাঁকে আপন করে দেয়।’
আনার ছোট ভাই ব্রাজিলের পতাকা আঁকে, কিন্তু মোবাইলের ওয়ালপেপারে মেসি। আনা বললেন, ‘আমরা ওকে খেপাই। সে বলে, ব্রাজিল আমার দল, মেসি আমার খেলোয়াড়।’

মেসির প্রতি এই সম্মানের পেছনে আরেকটি ঘটনার কথাও ব্রাজিলিয়ানরা মনে রাখেন। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা জয়ের পর আর্জেন্টিনার ড্রেসিংরুমে যখন কেউ কেউ ব্রাজিলকে খোঁচা দিয়ে গান ধরেছিল, মেসি নাকি তা থামিয়ে দেন। ব্রাজিলিয়ানদের কাছে ঘটনাটি ছোট হলেও অর্থ বড়। প্রতিদ্বন্দ্বীর মাঠে জিতেও প্রতিপক্ষকে অপমান না করা—এই সৌজন্য তাঁকে আরও আলাদা করেছে।

২০২৩ সালে মারাকানায় ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ম্যাচেও বহু ব্রাজিলিয়ান দর্শক মেসিকে দেখতে গিয়েছিলেন। ম্যাচের উত্তেজনা ছিল, ঝামেলাও হয়েছিল, কিন্তু মেসিকে ঘিরে কৌতূহল কমেনি। ব্রাজিলের মাটিতে হয়তো সেটিই ছিল তাঁর শেষ বড় ম্যাচগুলোর একটি—এই ভাবনাও অনেককে টেনেছিল।

রিও, সাও পাওলো, সালভাদর—বড় শহরগুলোতে আজকাল মেসির জার্সি পরা ব্রাজিলিয়ানও চোখে পড়ে। ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা ম্যাচের দিনেও কেউ কেউ আর্জেন্টিনার জার্সি পরে মেসিকে সম্মান জানান। প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে, কিন্তু ঘৃণা নয়। এটাই ব্রাজিলিয়ান ফুটবল-সংস্কৃতির বড় শিক্ষা।

বাংলাদেশে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে যে বিদ্রুপ, তর্ক, কখনও তিক্ততা দেখা যায়—ব্রাজিলে তার উল্টো ছবি চোখে পড়ে। তারা প্রতিপক্ষকে হারাতে চায়, কিন্তু প্রতিভাকে ছোট করে না।

তাঁদের চোখে মেসি শুধু আর্জেন্টিনার অধিনায়ক নন। তিনি এক শিল্পী, বিনয়ী মানুষ, বিশ্ব ফুটবলের এক বিরল আইকন। রাইভালের দেশেই তাই তাঁর মাথায় উঠেছে অদৃশ্য এক মুকুট—যার নাম শ্রদ্ধা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত