দল গোছাতে শুরু করেছে বিএনপি

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৩:১৫ এএম

 

 

প্রায় ৯ বছর পর আগামী ডিসেম্বরে দলের সপ্তম কাউন্সিল করতে চায় বিএনপি। এ লক্ষ্যে সরকার গঠনের ৫ মাস পর দল গোছানোর কাজে মনোযোগ দিয়েছেন দলীয় চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মেয়াদোত্তীর্ণ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নতুন কমিটি, কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন এবং সাংগঠনিক স্থবিরতা কাটাতে বৈঠক শুরু করেছেন তিনি। গত শনিবার রাতে ঢাকা জেলা বিএনপি, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ও স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সাধারণত প্রতি তিন বছর পর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও, সর্বশেষ ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর চলতি বছরে কাউন্সিল করার কথা জানিয়েছিলেন দেশ রূপান্তরকে। আসন্ন কাউন্সিলে দলের সাংগঠনিক পুনর্গঠন ও নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ১ মে শ্রমিক দিবস উপলক্ষে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ওইদিন রাতে দলের মহাসচিবসহ জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে বসেছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান।

জানা গেছে, সরকার গঠনের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দল পুনর্গঠনে জোর দিয়েছেন। ‘অল-আউট রিসেট’ পরিকল্পনার আওতায় বিএনপিতে পুনর্গঠনের চিন্তা চলছে। এ উদ্যোগে তুলনামূলক তরুণ, সক্রিয় ও মাঠমুখী নেতাদের কেন্দ্রীয় কমিটি ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে আনার পরিকল্পনা রয়েছে, যা নেতৃত্বে প্রজন্মগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অভিজ্ঞ জ্যেষ্ঠ নেতাদের উপদেষ্টা হিসেবে রাখারও ভাবনা রয়েছে, যাতে অভিজ্ঞ ও নতুন নেতৃত্বের ভারসাম্য থাকে। নিষ্ক্রিয় নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে সরানোর বিষয়েও আলোচনা চলছে।

বিএনপির নেতারা বলছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের নিরসন ঘটিয়ে ও দলকে পুনর্গঠিত করে চলতি বছরে দলের কেন্দ্রীয় কাউন্সিল করার লক্ষ্যে ধারাবাহিকভাবে দল এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারেক রহমান। গত শনিবার রাতে গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি, ঢাকা জেলা বিএনপি এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাদের সঙ্গে পৃথক পৃথক বৈঠক করেন তিনি। গুলশান কার্যালয়ে কর্মরত সব স্টাফকে নিয়মিত অফিসে হাজির থাকার নির্দেশও দিয়েছেন তারেক রহমান।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘সরকার পরিচালনায় ব্যস্ততার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে দলীয় কর্মকা-ে কিছু স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। নেতাকর্মীরাও ব্যবসা-বাণিজ্যে মনোযোগী হয়ে পড়ছেন। তাই আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সেই স্থবিরতা কাটিয়ে সংগঠনকে নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত করাই তারেক রহমানের মূল লক্ষ্য। অভ্যন্তরীণ কোন্দল কমিয়ে দলকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি।

বিএনপির একাধিক দায়িত্বশীল নেতা মনে করছেন, এ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সংগঠনে নতুন গতি আসবে এবং ঝুলে থাকা সাংগঠনিক প্রক্রিয়াও শেষ করার সুযোগ তৈরি হবে।

বিএনপির গুলশান কার্যালয়ের সূত্রে জানা গেছে, তারেক রহমান শুরুতে ঢাকা জেলার নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন; এরপর দলের অঙ্গ সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ ৩ নেতার সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে তারেক রহমান স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাদের কাছে সংগঠনের সার্বিক বিষয়ে জানতে চান। সংঠনটির নতুন কমিটির দেওয়ার ইঙ্গিত দেন তিনি।

নাম প্রকাশ করে কথা বলতে রাজি হননি বৈঠকে অংশ নেওয়া কোনো নেতা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতা বলেন, ‘এখানে লুকোচুরি করার তো কিছু নেই, আমাদের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। সংগঠনের সভাপতি এস এম জিলানী বর্তমানে সংসদ সদস্য আর সাধারণ সম্পাদক প্রতিমন্ত্রী। দীর্ঘদিন সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার কারণে অনেক জেলায় কাউন্সিল করাও সম্ভব হয়নি। এখন নতুন কমিটি হওয়াই স্বাভাবিক।’

ওই নেতা বলেন, নতুন কমিটি কবে হবে তার সুনির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ করেননি প্রধানমন্ত্রী। ধারণা করা যায়, আগামী ৫ আগস্টের আগেই নতুন কমিটি হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী দ্রুত কমিটি করার নির্দেশও দিয়েছেন। একইসঙ্গে সর্তক করেছেন, কমিটি গঠনে যেন বিতর্কের জন্ম না হয়।

সূত্রে আরও জানা গেছে, সর্বশেষ ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রায় আধা ঘণ্টার ওই বৈঠকে তিনি সংগঠনের বর্তমান অবস্থা, নেতাকর্মীদের সক্রিয়তা, থানা-ওয়ার্ড কমিটির মেয়াদ এবং ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, তারেক রহমান স্পষ্টভাবে বলেছেন, অনেক কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এসব কমিটিকে পুনর্গঠিত করতে হবে এবং যেখানে সম্ভব কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন করতে হবে। এতে সংগঠন আরও গণতান্ত্রিক ও গ্রহণযোগ্য হবে।

বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু বলেন, প্রধানমন্ত্রী নেতাকর্মীদের খোঁজ নিয়েছেন। নেতাকর্মীদের দলীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ বাড়িয়ে দলকে শক্তিশালী করার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।

গতকাল রবিবার নয়াপল্টনে মহানগর বিএনপি কার্যালয়ে বৈঠক করেছেন মহানগরের নেতারা। তারা দলের সাংগঠনিক অবস্থার পর্যালোচনা করেছেন। সংগঠনকে গতিশীল করতে শিগগির তারা কার্যক্রম শুরু করবেন।

দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী আগস্ট মাস থেকে পর্যায়ক্রমে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলোকে পুনর্গঠনের কাজ শুরু হতে পারে; যদিও এখনো আনুষ্ঠানিক সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়নি।

বিএনপির একটি সূত্র বলছে, ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি ও বাকি অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাদের শীর্ষ সঙ্গে বৈঠকের পর পর্যায়ক্রমে সারা দেশের অন্য মহানগর ও জেলার সঙ্গেও বৈঠকে বসবেন বিএনপি চেয়ারম্যান।

পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গত ৪ জুন আবদুল মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি এবং মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে ১৫১ সদস্যবিশিষ্ট জাতীয়তাবাদী যুবদল কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি অনুমোদন করা হয়েছে। বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এরপর গতিশীল হয়েছে যুবদল। সাংগঠনিক কর্মকা- শুরু করেছে তারা। গত ২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে সামনে রেখে যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাদের সমন্বয়ে একাধিক টিম গঠন করা হয়েছিল। তারা বিভিন্ন জেলা সফর করে সাংগঠনিক অবস্থা জেনে এসেছেন।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে, শিগগির ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণা করা হবে। এরপর স্বেচ্ছাসেবক দলের।

স্বেচ্ছাসেবক দলকে গতিশীল করতে বিএনপির হাইকমান্ড বর্তমানে ছাত্রদলের সাবেক শীর্ষ নেতাদের সমন্বয়ে নতুন নেতৃত্ব বা ‘সুপার ফাইভ’ গঠনের বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ পদে থাকা নেতারা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় সংগঠনে তাদের সময় দেওয়ার সুযোগ কমে যাওয়ায় এ পুনর্গঠন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত