গৌরবের অহংকার নিয়ে নানামুখী চ্যালেঞ্জ

আপডেট : ০৬ জুলাই ২০২৬, ০৪:৩৪ এএম

সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও নেতৃত্ব বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি)। ১৯৫৩ সালের ৬ জুলাই যাত্রা শুরু করা দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই বিদ্যাপীঠ ৭৩ বছরে পা রেখেছে। দীর্ঘ এই পথচলায় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গৌরব যেমন সমৃদ্ধ হয়েছে, তেমনি গবেষণা, আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা, আবাসন সুবিধার উন্নয়ন এবং বৈষম্যহীন, নিরাপদ ক্যাম্পাস গড়ে তোলার প্রত্যাশাও সামনে এসেছে।

ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়। বর্তমানে প্রায় ৩২ হাজার শিক্ষার্থী, শতাধিক বিভাগ ও ইনস্টিটিউট এবং ১৭টি আবাসিক হল নিয়ে দেশের উচ্চশিক্ষার অন্যতম বৃহৎ কেন্দ্র হিসেবে রাবির পথচলা অব্যাহত রয়েছে।

তবে দীর্ঘ এই যাত্রায় অপূর্ণতাও রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা, গবেষণায় সীমাবদ্ধতা ও সীমিত বরাদ্দ, আবাসন সংকট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইয়ামিন হোসেন বলেন, গবেষণা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, আধুনিক গবেষণাগার স্থাপন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং তরুণ গবেষকদের জন্য আরও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এতে গবেষণার বাস্তব প্রয়োগ যেমন বাড়বে, তেমনি নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হবে। শিক্ষার্থীদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা আবাসন সংকট। নতুন আবাসিক হল নির্মাণ, সুষ্ঠু সিট বণ্টন, উন্নত গবেষণা পরিবেশ, আধুনিক গ্রন্থাগার, নিরাপদ ক্যাম্পাস এবং আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা নিশ্চিত করার দাবি তাদের। প্রাণিবিদ্যা বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী হাবিবা আক্তার রিয়া বলেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি আমাদের স্বপ্ন ও পরিচয়ের অংশ। আমরা চাই গবেষণার আরও প্রসার, আধুনিক শিক্ষা-সুবিধা, আবাসন সমস্যার সমাধান এবং একটি নিরাপদ, বৈষম্যহীন ক্যাম্পাস, যেখানে জ্ঞানচর্চা ও মানবিক মূল্যবোধ সমানভাবে বিকশিত হবে।’

একই প্রত্যাশার কথা জানিয়ে ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী সাকিব ইসলাম বলেন, ‘শতভাগ আবাসিকতা, ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের উন্নয়ন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, মেডিকেল সেন্টারের সেবার মান বৃদ্ধি ও নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সিট বাণিজ্য বন্ধ, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি এবং সার্বিক নিরাপত্তা জোরদারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।’

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (রাকসু)’র সহসভাপতি (ভিপি) মোস্তাকুর রহমান জাহিদ বলেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭৩ বছরের গৌরবময় ইতিহাস আমাদের জন্য গর্বের। তবে এ ঐতিহ্য ধরে রাখতে শিক্ষার গুণগত মান, গবেষণার সুযোগ-সুবিধা, আবাসন সংকটের সমাধান এবং শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। আমরা চাই বিশ্ববিদ্যালয় এমন একটি ক্যাম্পাসে পরিণত হোক, যেখানে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ, বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশে শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে ‘রাকসু’ শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করে যাবে।’

৭৩ বছর পদার্পণের এ সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও আধুনিক ও গবেষণাবান্ধব প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে নানা পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা জানিয়েছে প্রশাসন। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে একটি আধুনিক, গবেষণাবান্ধব ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করাই আমাদের লক্ষ্য। বর্তমানে প্রায় ৩৩ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধা পাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে এ সংখ্যা বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে সেশনজট শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা, গবেষণার মান উন্নয়ন এবং উচ্চশিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা জোরদারে সিসিটিভি স্থাপন, আলোকায়ন বৃদ্ধি এবং গবেষণায় সরকারি বরাদ্দ কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত