চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বটতলী গ্রামের শ্রীমতি খাল ময়লা-আবর্জনায় প্রায় ভরাট হয়ে গেছে। দেয়াঙ পাহাড় থেকে নেমে আসা প্রায় তিন কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালে বর্জ্যরে কারণে পানিপ্রবাহ পুরোপুরি বন্ধ। এ ছাড়া খালটি ঘাস, আগাছা ও জলজ উদ্ভিদে পূর্ণ। মৃতপ্রায় খালটি এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। পানি নিষ্কাশনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হলেও এ নিয়ে দায়িত্বশীলদের কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি।
উপজেলার দেয়াঙ পাহাড়ের প্রাকৃতিক ঝরনাধারা থেকে এই খালের সৃষ্টি হয়েছে। পরে বটতলী কুলাল পাড়া, জয়নগর পাড়া, রুস্তম হাট, মল্লা পাড়া, দোভাষীর পাড়া, মমতাজ পাড়া, হলদিয়া পাড়া হয়ে শঙ্খ নদের অংশ মোহছেন আউলিয়া খালের সঙ্গে খালটি মিশেছে। স্থানীয় ব্যক্তিবর্গ ও নথিপত্রে এটি শ্রীমতি খাল নামেই পরিচিত। তিন দশক আগেও এই খালে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বীরা পূজা-পার্বণ করতেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
গত শুক্রবার সরেজমিনে দেখা যায়, খালের ওপর নির্মিত মোহছেন আউলিয়া সড়কের কালভার্ট ঘেঁষে দুই পাশেই ফেলা হচ্ছে রুস্তম হাটের বর্র্জ্য। এ ছাড়া খালের উভয় পাশে গড়ে ওঠা গরুর খামার, পোলট্রি ফার্ম, কসাইখানা, স’মিল ও গৃহস্থালির বর্জ্যও ফেলা হচ্ছে এই খালে। দীর্ঘদিন খালটি খনন না করায় ঘাস, আগাছা ও জলজ উদ্ভিদে ছেয়ে গেছে। ৩০ থেকে ৩৫ ফুট চওড়া খালের তলদেশ কৃষি ক্ষেতের সমতলে এসে দাঁড়িয়েছে। বর্ষা মৌসুমেও খালের বেশিরভাগ এলাকায় পানি সম্পূর্ণ শুকিয়ে গেছে।
কালভার্টের ওপর দাঁড়িয়ে দেখা যায়, কালভার্ট থেকে দুদিকে ৫০ ফুটের মতো অংশে সরু নালার মতো জায়গা দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়ে সামনের দিকে যাচ্ছে। খালের বেশিরভাগ অংশে জলজ আগাছায় পূর্ণ। স্থানীয় ব্যক্তিরা খালের মাঝখানে হাঁটাচলা করছেন। বিচ্ছিন্নভাবে খালের অংশে কিছু স্থাপনাও আছে।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক সময় পানির তীব্র স্রোত ছিল এই খালে। খালের পানি ব্যবহার হতো আশপাশের কৃষকদের জমি চাষে। অথচ বর্তমানে বড় একটি অংশজুড়ে রুস্তমহাটের ব্যবসায়ীরা প্রতিদিন ময়লা-আবর্জনা ও অপচনশীল দ্রব্যাদি ফেলছেন। এতে করে খাল হারিয়েছে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ। ময়লা-আবর্জনা ও জমে থাকা পানিতে সৃষ্ট দুর্গন্ধে রোগব্যাধি ছড়ানোর আশঙ্কাও বাড়ছে দিন দিন।
স্থানীয় বাসিন্দা ছৈয়দ নুর বলেন, ‘একসময় এই পানি আমরা খাইতাম। অনেক গভীর ছিল খালটি। অনেক চওড়া ছিল। একসময় জোয়ারভাটা হতো। এই খালের ওপর দিয়ে রাস্তা হয়েছে। পাকা কালভার্ট হয়েছে। চোখের ওপরে খালটা মরে গেল।’ স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বটতলী ইউনিয়নের পরীর বিল, রুস্তমহাটসহ অন্তত ১০টি পাড়ার পানি নালা দিয়ে এই খালে পড়ে। চলতি বছরে খালটির সংযোগ অংশ খনন করা হয়। তবে শ্রীমতি খালটি খনন না করায় কোনো উপকার মিলছে না। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও নির্বিচারে আবর্জনা ফেলার কারণে ধীরে ধীরে খালটি ভরাট হয়ে যাচ্ছে। জানতে চাইলে রুস্তমহাট ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির (একাংশ) সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম বলেন, ‘শুধু আমাদের ময়লা নয়, পুরো রুস্তমহাটের ময়লা-আবর্জনা সেখানে ফেলা হয়। এমনকি গৃহস্থালির ময়লাও ফেলা হচ্ছে। এতে যদি খালের ক্ষতি হয়, তাহলে ময়লা ফেলা বন্ধ করে দেব।’
স্থানীয় ইউপি সদস্য মোহাম্মদ হারুন বলেন, ‘১০ থেকে ১৫ বছর আগেও খালটা ভালো ছিল। সব ধরনের দেশি মাছ এই খালে পাওয়া যেত। রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আবর্জনা-ময়লায় খালটা নষ্ট হয়ে গেছে। তবে দখল এখনো নিয়ন্ত্রণে আছে।’
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) উপজেলা উপ-সহকারী প্রকৌশলী আজমানুর রহমান বলেন, ‘খালটি প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির আওতায় বাস্তবায়ন তালিকায় রয়েছে। বরাদ্দ পেলেই খালের খননকাজ শুরু করা হবে।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক মনিরা পারভিন বলেন, ‘এখানকার বাস্তুতন্ত্র বজায় রাখতে হলে সব বাধা অপসারণ করে মূল নদীর সঙ্গে খালগুলোর সংযোগ ঘটিয়ে অবাধ পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে। যারা ময়লা-আবর্জনা ফেলে খালের ক্ষতি করছেন, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। তাহলেই আর এ ধরনের কাজ করবেন না। প্রত্যেক এলাকার মানুষকে সচেতন থেকে খাল রক্ষায় খেয়াল রাখতে হবে।’
আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মহিন উদ্দিন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি প্রকল্পের আওতায় খালটি খনন ও দুই পাড় বাঁধাই করা হবে। তার আগে ব্যবসায়ীদের সতর্ক করে বর্জ্য অপসারণের ব্যবস্থা করা হবে।’