চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রীর চরম সংকট সত্ত্বেও রেকর্ডসংখ্যক স্বাভাবিক প্রসব (নরমাল ডেলিভারি) করিয়ে অনন্য নজির স্থাপন করেছে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসেই হাসপাতালটিতে মোট ৪৩১টি শিশুর জন্ম হয়েছে, যার মধ্যে ৪১৩টিই ছিল নরমাল ডেলিভারি। অন্যদিকে, সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার লেগেছে মাত্র ১৮টিতে। ফুলবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সিজারের তুলনায় নরমাল ডেলিভারির হার দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরছে। বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকের মোটা অঙ্কের খরচ এড়িয়ে এখন সব শ্রেণিপেশার মানুষ এই সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই সন্তান প্রসবের দিকে ঝুঁকছেন। এছাড়া প্রসবের পরপরই হাসপাতাল থেকে নবজাতকদের একটি করে বিশেষ সনদ দেওয়া হচ্ছে, যা পরবর্তী সময়ে শিশুর জন্মনিবন্ধনসহ অন্যান্য দাপ্তরিক কাজকে আরও সহজ করে তুলছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কর্তৃপক্ষের দাবি, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইফদের আন্তরিকতা ও দক্ষতার কারণেই স্বাভাবিক সন্তান প্রসবের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। যেসব প্রসূতি মায়ের এবং গর্ভের সন্তানের ঝুঁকি থাকে শুধু তাদেরই সিজারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করানো হচ্ছে। গর্ভবতী মায়েদের প্রসব-পূর্ববর্তী ও প্রসব-পরবর্তী সার্বিক চিকিৎসাসেবা ও পরামর্শ প্রদানের কারণে নরমাল ডেলিভারির সংখ্যা বাড়ছে। একই সঙ্গে গর্ভবতী মায়েদের সরকারি স্বাস্থ্যসেবার প্রতি আস্থাও বাড়ছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকে হাসপাতালের বহির্বিভাগে রোগীর দীর্ঘ সারি। দোতলায় কর্তব্যরত মিডওয়াইফদের রুমে গর্ভবতী রোগীদের ভিড়। কর্তব্যরত মিডওয়াইফরা গর্ভবতী রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ওষুধ প্রদান করছেন এবং পরামর্শ দিচ্ছেন। কর্তব্যরত মিডওয়াইফদের ব্যবহারে খুশি রোগী ও তাদের স্বজনরা।
ফুলবাড়ী উপজেলার চন্দ্রপুর গ্রাম থেকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছেন গর্ভবতী গৃহবধূ কৃষ্ণা রানী। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালের মিডওয়াইফ বিভাগের আপারা আমাদের সঙ্গে ভালোভাবে কথা বলেন। আমরা এই সময়ে কীভাবে চলাফেরা করব বা কী কী খেলে উপকৃত হব তা আমাদের বুঝিয়ে দেন। তাদের ব্যবহার খুবই ভালো।’
উপজেলার গফুরহাট এলাকা থেকে চিকিৎসা নিতে এসেছেন গৃহবধূ রশিদা বেগম। তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা ভালো পাওয়া যায়। এছাড়া সব ধরনের ওষুধ পাওয়া যায়। মাঝে মধ্যে সরবরাহ না থাকলে কিছু কিছু ওষুধ বাইরে থেকে কিনে নিতে হয়। প্রশ্ন করলে চিকিৎসকরা আমাদের ভালোভাবে বুঝিয়ে উত্তর দেন।’
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন প্রসূতি আসমা বেগম বলেন, ‘আগে প্রথমে নরমাল ডেলিভারি নিয়ে খুব ভয় কাজ করত। কিন্তু এই হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফদের সহায়তায় আমার নরমাল ডেলিভারি হয়েছে। আমার সন্তান এখন সুস্থ আছে। কিন্তু হাসপাতালে আসার আগের অবস্থায় অন্য কোনো ক্লিনিক বা হাসপাতালে গেলে সেখানে সিজারের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হতো।’
হাসপাতালের মিডওয়াইফ আফরোজা বানু বলেন, ‘আমাদের বিভাগে মোট ৬ জন মিডওয়াইফ রয়েছি। হাসপাতালে ৬ জনের বিপরীতে যে পরিমাণ রোগী আসে, তাতে আমাদের কষ্ট বেড়ে যায়। আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ জানাইÑ এই হাসপাতালে আরও যেন মিডওয়াইফ দেওয়া হয়। তাহলে আমরা ফুলবাড়ী ও আশপাশের মানুষদের সেবা দিতে পারব।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত এই হাসপাতালে মোট ডেলিভারি হয়েছে ৪৩১টি। এর মধ্যে ৪১৩টি নরমাল ও ১৮টি সিজার। জানুয়ারি মাসে ৮১টি নরমাল ও ৪টি সিজার, ফেব্র“য়ারি মাসে ৬৯টি নরমাল ও ৪টি সিজার, মার্চ মাসে ৬৪টি নরমাল ও ৩টি সিজার, এপ্রিল মাসে ৬১টি নরমাল ও ৪টি সিজার, মে মাসে ৭২টি নরমাল ও ৩টি সিজার এবং জুন মাসে ৬৬টি নরমাল ডেলিভারি হয়েছে এই হাসপাতালে।
এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪১টি চিকিৎসক পদের মধ্যে ২৭টিই শূন্য, কর্মরত আছেন মাত্র ১৪ জন। চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি অন্যান্য জনবলেও চরম ঘাটতি রয়েছে। এখানে ৫ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর বিপরীতে আছেন ৩ জন এবং ২৫ জন টিকাদান কর্মীর মধ্যে ১৩টি পদই ফাঁকা। এছাড়া ৮টি সুপারভাইজার পদ, ৩টি ওয়ার্ডবয় পদ এবং ২টি আয়ার পদের সবকটিই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পড়ে আছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, গুরুত্বপূর্ণ এই হাসপাতালে কোনো গাইনি ও অ্যানেসথেসিয়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই।
হাসপাতালের সহকারী সার্জন ডা. মো. আলমগীর কবির বলেন, ‘ফুলবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫০ শয্যা বিশিষ্ট হলেও রোগীর চাপ অনেক বেশি থাকে। অনেক ক্ষেত্রে ৮০-এর বেশি রোগী ভর্তি থাকেন। কিন্তু হাসপাতালে অনেক চিকিৎসক সংকট রয়েছে। নার্স ও মিডওয়াইফ রয়েছে যথেষ্ট। কিন্তু রোগীর তুলনায় তাদের সংখ্যাটাও অপ্রতুল। বাড়তি রোগীকে চিকিৎসাসেবা দিতে গিয়ে আমরা হিমশিম খাচ্ছি।’
দিনাজপুরের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. মো. গোলাম রসুল রাখি বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে ৪৮ বিসিএসের চিকিৎসক সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দিয়েছি। সেই ক্ষেত্রে চিকিৎসক সংকট থাকার কথা নয়। আগে চিকিৎসক সংকট বেশি ছিল। এখন চিকিৎসক সংকট সহনীয় পর্যায়ে থাকার কথা। তারপরও ফুলবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগীর সংখ্যা যদি বেশি হয় এবং নরমাল ডেলিভারি বেশি হয়, তাহলে অন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে থেকে চিকিৎসক সেখানে দেওয়ার চিন্তা করতে পারি। এছাড়া সেখানে কিছু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সংকট রয়েছে। আমরা সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেওয়ার বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করছি।’