যে কারণে পরীক্ষার্থীর কাছে ভুল প্রশ্ন

আপডেট : ০৮ জুলাই ২০২৬, ০৭:১৯ এএম

অভিন্ন প্রশ্নপত্রে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরুর দিন ুথেকে ভুল প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে শিক্ষার্থীরা তাদের কাক্সিক্ষত ফলাফল পেতে ব্যর্থ হলে এর দায় কে নেবে তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। তাদের দাবি, আমরা দুই বছর পড়ালেখা করেছি নির্ধারিত প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দেওয়ার জন্য, কিন্তু পরীক্ষার হলে আমাদের ভুল প্রশ্নপত্র দেওয়া হলো কেন? ভুল প্রশ্নপত্র দেওয়ার ঘটনা শুধু এক বা দুটি কেন্দ্রে নয়, দেশের বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের কেন্দ্রে ঘটেছে। তবে ভুল প্রশ্নপত্রের কারণে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না বলে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড থেকে আশ^স্ত করা হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়। প্রথম দিন ছিল বাংলা প্রথমপত্রের ও দ্বিতীয় দিন ৪ জুলাই ছিল বাংলা দ্বিতীয়পত্রের পরীক্ষা। পরীক্ষার্থীরা তিন ঘণ্টা পরীক্ষা দিয়ে বের হয়ে আসার পর জানতে পারে ২০২৫ সালের প্রশ্নপত্রে তারা পরীক্ষা দিয়েছে। ময়মনসিংহ বোর্ডের জামালপুর সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ কেন্দ্রে বাংলা দ্বিতীয়পত্রের পরীক্ষার দিন একটি কক্ষের ১০০ পরীক্ষার্থীর ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটে। নিয়মিত এসব পরীক্ষার্থী ২০২৫ সালের শিক্ষার্থীদের সিলেবাসে প্রণীত প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিয়েছে। এর আগে ২ জুলাই মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের আলিম পরীক্ষার প্রথম দিনে ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার হদুয়া বৈশাখিয়া কামিল মাদ্রাসা কেন্দ্রেও কুরআন মাজিদ বিষয়ের পরীক্ষায় ৬০ জন নিয়মিত পরীক্ষার্থীর কাছে অনিয়মিত (২০২৫ সালের) পরীক্ষার্থীদের প্রশ্নপত্র বিতরণ করা হয়েছে।

পরীক্ষায় নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের কাছে অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের প্রশ্নপত্র কীভাবে বিতরণ হচ্ছে জানতে কথা হয় ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. আ খ ম কামাল হাসানের সঙ্গে। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের হাতে অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের প্রশ্নপত্র বিতরণের বিষয়টি শুধু আমার বোর্ডের সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ কেন্দ্রের ৪২০২ নম্বর কক্ষের ১০০ জন পরীক্ষার্থীর ক্ষেত্রেই ঘটেনি। পরীক্ষার প্রথম দুই দিন দেশের বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের আওতাধীন বিভিন্ন পরীক্ষাকেন্দ্রে ঘটেছে। তবে ইংরেজি প্রথমপত্রের পরীক্ষায় কিন্তু এমন ঘটনা ঘটেনি।

নিয়মিত পরীক্ষার্থীদের হাতে কেন অনিয়মিত পরীক্ষার্থীর প্রশ্নপত্র : এই ভুল কেন হচ্ছে জানতে কথা হয় চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক প্রফেসর ড. পারভেজ সাজ্জাদ চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা কেন্দ্র সচিবদের নির্দেশনা দিয়ে রেখেছি নিয়মিত ও অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের ভিন্ন ভিন্ন কক্ষে বসানোর জন্য। কিন্তু অনেক কেন্দ্রে পরিদর্শক ও কক্ষ সংকটের কারণে হয়তো নিয়মিত ও অনিয়মিত একই কক্ষে সিট বসিয়েছে। আর এতে প্রশ্নপত্র বিতরণের সময় সবাইকে একই প্রশ্ন দিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং ভুলের ঘটনা ঘটছে।’

বিভিন্ন বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও কেন্দ্র সচিবের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের ট্রেজারি থেকে ২০২৬ সালের নিয়মিত ও ২০২৫ সালের অনিয়মিত উভয় সেশনের পরীক্ষার্থীদের প্রশ্ন কেন্দ্র সচিবরা নিয়ে আসেন পরীক্ষার দিন সকালে। পরে আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বিভিন্ন বোর্ড চেয়ারম্যানকে সকালে জানিয়ে দেন ২০২৬ সালে কোন সেট কোডে ও ২০২৫ সালের শিক্ষার্থীরা কোন সেট কোডে পরীক্ষা দেবে। আর এই সেট কোডের বিষয়টি জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসন হয়ে কেন্দ্র সচিবদের জানানো হয়। পরীক্ষা কেন্দ্রে সকাল ৯টার দিকে নির্দেশনা অনুসারে প্রশ্নপত্র সেট কোড অনুযায়ী বণ্টনও হয়ে যায়। কিন্তু একই রুমে যখন নিয়মিত ও অনিয়মিত পরীক্ষার্থী থাকে তখনই এই ভুল ঘটছে বলে জানান সবাই। এ বিষয়ে কথা হয় সীতাকু- ডিগ্রি কলেজ কেন্দ্রের কেন্দ্র সচিব ও ভাইস প্রিন্সিপাল অধ্যাপক মোহাম্মদ মুসার সঙ্গে। তিনি বলেন, নিয়মিত ও অনিয়মিত একই রুমে বসালে এমন ভুল হতে পারে। এ ছাড়া প্রশ্নপত্রের প্যাকেট খোলার পর ম্যানেজমেন্টগত ভুল করা হলেও কক্ষভিত্তিক ভুল প্রশ্ন চলে যেতে পারে। তাই এ বিষয়গুলো খুবই খেয়াল রাখতে হয়।

এ দিকে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড থেকে গত ৩ জুলাই নিয়মিত ও অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের পৃথক পৃথক কক্ষে বসানোর জন্য কেন্দ্র সচিবদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

পরীক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না : ভুক্তভোগী অনেক শিক্ষার্থী তাদের কাক্সিক্ষত ফলাফল পাবে কি না তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে মিডিয়ার কাছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের দায়িত্বে থাকা প্রফেসর জেসমিন তাসলিমা বানূ বলেন, ‘কোনো পরীক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। নিয়মিত যেসব পরীক্ষার্থী অনিয়মিত পরীক্ষার্থীদের প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিয়েছে সেসব উত্তরপত্রগুলো আলাদা করে আমাদের কাছে পাঠানোর জন্য কেন্দ্র সচিবদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাদের উত্তরপত্র বিশেষভাবে মূল্যায়ন করা হবে। কোনো শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।’

অভিযুক্ত কেন্দ্রগুলোর শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা : এদিকে ভুল প্রশ্নপত্র বিতরণের দায়ে ইতিমধ্যে বিভিন্ন কেন্দ্রের পরিদর্শকদের প্রত্যাহার করে নেওয়া ছাড়াও কেন্দ্র সচিবদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ড. আ খ ম কামাল হাসান বলেন, ‘আমার বোর্ডের আওতাধীন সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজের কেন্দ্র সচিব, ট্যাগ অফিসার, পরীক্ষা কমিটির আহ্বায়ক এবং কক্ষ পরিদর্শকের দায়িত্বে যারা ছিল সবাইকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।’ চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডেও এমন ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানা যায়।

প্রফেসর জেসমিন তাসলিমা বানূ বলেন, পরীক্ষা পরিচালনায় যারা ভুল করবে তাদের বিরুদ্ধে পাবলিক পরীক্ষা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, এবারই ২০১৪ সালের পর থেকে সারা দেশের সব শিক্ষা বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্র দিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। দেশের কোনো একটি কেন্দ্রে প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে সারা দেশের পরীক্ষা বাতিল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে। আবার এই পদ্ধতিতে সারা দেশের শিক্ষার্থীদের মেধার মূল্যায়ন একই রকম হবে। এবার দেশের ৮টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ১০ লাখ ৬৯ হাজার ৭১৪ জন এবং মাদ্রাসা বোর্ডে ৯২ হাজার ৯০৫ ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ১ লাখ ৭ হাজার ৯৬৪ জন পরীক্ষার্থী এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত