কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার বক্সগঞ্জ ইউনিয়নের দক্ষিণ আলিয়ারা গ্রামে তিনটি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে গত সাত মাস ধরে প্রায় ২০০ পরিবার নিজ বাড়িঘর ছেড়ে অন্যত্র মানবেতর জীবনযাপন করছে। একসময় জনবসতিপূর্ণ গ্রামটি এখন প্রায় জনশূন্য। পরিত্যক্ত ঘরবাড়ি, ভাঙচুরের চিহ্ন, আগুনে পোড়া স্থাপনা এবং লতাপাতায় ঢেকে যাওয়া বসতভিটা যেন ভয়াবহ সংঘাতের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, গ্রামের প্রবেশমুখ থেকে শুরু করে বিভিন্ন বাড়ির দেয়ালে লাল কালি দিয়ে বড় অক্ষরে লেখা রয়েছে—‘খুনিদের বাড়ি’। অধিকাংশ বাড়ির দরজা-জানালা নেই, বিদ্যুতের সংযোগ বিচ্ছিন্ন, আসবাবপত্র লুট হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও আগুনে পুড়ে যাওয়া গোয়ালঘর ও ধ্বংসস্তূপ পড়ে আছে। দীর্ঘদিন বসবাস না থাকায় উঠান ও ঘরের ভেতর কোমরসমান ঘাস ও লতাগুল্ম জন্মেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, মাত্র কয়েক মাস আগেও দক্ষিণ আলিয়ারা ছিল একটি শান্তিপূর্ণ গ্রাম। তবে দীর্ঘদিনের আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের বিরোধ গত বছরের ৩ আগস্ট রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে রূপ নেয়। ওইদিন আলা উদ্দিন মেম্বারকে বাড়ির সামনে থেকে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর প্রতিপক্ষ ছালেহ আহমেদ গোষ্ঠীর বাড়িঘরে ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। প্রাণভয়ে ওই গোষ্ঠীর সদস্যরা গ্রাম ছেড়ে চলে যান।
এর প্রায় তিন মাস পর, চলতি বছরের ১৬ জানুয়ারি বিরোধ মীমাংসার কথা বলে ছালেহ আহমেদ গোষ্ঠীর লোকজনকে বৈঠকে ডাকা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, বৈঠকের একপর্যায়ে ছালেহ আহমেদ মেম্বার ও নয়ন নামে দুই ব্যক্তিকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
এই জোড়া হত্যাকাণ্ডের পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। আলা উদ্দিন মেম্বার গোষ্ঠীর প্রায় ২০০ পরিবারের সদস্যরা গ্রেপ্তার ও প্রতিপক্ষের হামলার আশঙ্কায় গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যান। অভিযোগ রয়েছে, তাদের অনুপস্থিতিতে বাড়িঘরে ব্যাপক ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ চালানো হয়।
বর্তমানে গ্রামটির অধিকাংশ বাড়িই পরিত্যক্ত। ভাঙচুরের চিহ্ন, পোড়া খড়ের গাদা এবং আগাছায় ঢেকে যাওয়া রান্নাঘর ও বসতঘর দীর্ঘদিনের জনশূন্যতার চিত্র তুলে ধরছে।
এই তিন হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে নাঙ্গলকোট থানা ও আদালতে হত্যা, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ, চুরি ও ভাঙচুরসহ অন্তত ২২টি মামলা হয়েছে। পুলিশ কয়েকটি মামলার অভিযোগপত্রও আদালতে জমা দিয়েছে। অনেক আসামি আদালত থেকে জামিন পেলেও প্রতিপক্ষের হামলার আশঙ্কায় নিজ গ্রামে ফিরতে পারছেন না বলে অভিযোগ করেছেন।
ভুক্তভোগীদের দাবি, আইনি প্রক্রিয়ায় জামিন পাওয়ার পরও গ্রামে প্রবেশ করতে গেলে প্রতিপক্ষ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে বাধা দেয়। প্রশাসনের কাছে একাধিকবার অভিযোগ জানিয়েও কার্যকর সমাধান পাননি বলে তাদের অভিযোগ। ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবন কাটাতে হচ্ছে।
গ্রামের বাসিন্দা ইয়াকুব আলী বলেন, আমার কী অপরাধ ছিল যে আমার বাড়িঘর ভাঙচুর করে আগুন দেওয়া হলো? ঘরের ভেতর কুমড়ো গাছ জন্মেছে, উঠান লতাপাতায় ভরে গেছে। পরিবার নিয়ে আর কতদিন বাইরে থাকব? আমাদের শুধু নিজ বাড়িতে নিরাপদে বসবাসের সুযোগ করে দেওয়া হোক।
এদিকে দীর্ঘদিন ধরে চলমান এই বিরোধের অবসান না হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি সত্ত্বেও যদি সংঘাত বন্ধ না হয়, তবে এই রক্তক্ষয়ী বিরোধের শেষ কোথায়?
এ বিষয়ে নাঙ্গলকোট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহীনুর আলম বলেন, এটি দুই পক্ষের দীর্ঘদিনের বিরোধ। এই বিরোধের জেরে দুই পক্ষে মোট তিনটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। উভয় পক্ষই থানায় একাধিক মামলা করেছে।
জামিনপ্রাপ্তদের গ্রামে ফিরতে বাধা ও পুলিশের হয়রানির অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, গত শনিবার একটি পক্ষ বাড়িতে ওঠার চেষ্টা করলে পুলিশ সেখানে যায়। আমাদের কাছে তথ্য ছিল, এলাকায় অবৈধ অস্ত্রধারী ও বিভিন্ন মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি রয়েছে। নতুন করে সংঘর্ষ এড়াতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। পুলিশ কোনো পক্ষের হয়ে নয়, আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করছে।
আগামীর বাংলাদেশ নির্মাণে তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ