মনপুরার সঙ্গে সারা দেশের নৌ যোগাযোগ বন্ধ, পানিবন্দি হাজারো মানুষ

আপডেট : ০৯ জুলাই ২০২৬, ০৯:১০ পিএম

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর এবং নদীবন্দরে ১ নম্বর সতর্কসংকেত বহাল থাকায় ভোলার দ্বীপ উপজেলা মনপুরার সঙ্গে সারা দেশের নৌ যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে টানা প্রায় এক সপ্তাহের ভারী বর্ষণ ও জোয়ারের পানিতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এতে হাজারো মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) দুপুর থেকে মনপুরাগামী সব যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করে ভোলা জেলা বিআইডব্লিউটিএর (নদীবন্দর) সহকারী পরিচালক নির্মল কুমার রায় বলেন, লঘুচাপজনিত বৈরী আবহাওয়া ও সতর্কসংকেতের কারণে যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে জেলার সব নৌপথে নৌযান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।

নৌযান চলাচল বন্ধ থাকায় হাজিরহাট সি-ট্রাক ঘাট ও রামনেওয়াজ-ঢাকা সার্ভিস ঘাটে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন যাত্রীরা। সকাল থেকে অনেকে ভোলা ও ঢাকার উদ্দেশে ঘাটে এলেও কোনো নৌযান না চলায় ফিরে যেতে বাধ্য হন। একইভাবে ঢাকা থেকেও কোনো লঞ্চ মনপুরায় পৌঁছাতে পারেনি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাজিরহাট ইউনিয়নের ৪, ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় ১৫ হাজার মানুষ বৃষ্টির পানিতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এছাড়া মনপুরা ইউনিয়নের ২ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ড এবং দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার আরও প্রায় ১০ হাজার মানুষ জলাবদ্ধতার দুর্ভোগে রয়েছেন। দীর্ঘ সময় পানি জমে থাকায় অসংখ্য ঘরবাড়ির মেঝে ও রান্নাঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। রান্নার চুলা তলিয়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার ঠিকমতো রান্না করতে পারছে না। দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের মানুষের অনেকেই কাজে যেতে না পারায় খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন।

অবিরাম বর্ষণে হাজিরহাট ইউনিয়নের চরযতিন, দাসেরহাট, সোনারচর ও চরজ্ঞান, সাকুচিয়া ইউনিয়নের চরগোয়ালিয়া ও মাস্টারহাট, দক্ষিণ সাকুচিয়ার রহমানপুর এবং মনপুরা ইউনিয়নের কাউয়ারটেক ও আন্দিরপাড় গ্রামের অধিকাংশ ঘরবাড়িতে ২ থেকে ৩ ফুট পর্যন্ত পানি জমে রয়েছে। ডুবে গেছে গ্রামীণ সড়ক, উঠান ও রান্নাঘর।

হাজিরহাটের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, টানা পাঁচদিনের বৃষ্টিতে প্রথমে বাড়ির চারপাশে পানি জমে। পরে সেই পানি ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে। আমরা গরিব মানুষ। একদিন কাজ না করলে পরিবারের খাবার জোটে না। কিন্তু বৃষ্টির কারণে কাজে যেতে পারছি না। অনেক পরিবার চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছে।

তাদের অভিযোগ, স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশনের পথ বিভিন্ন স্থানে দখল হয়ে যাওয়ায় জলাবদ্ধতা আরও তীব্র হয়েছে। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

হাজিরহাট ইউনিয়নের দাসেরহাট এলাকার বাসিন্দা মফিজ মিস্ত্রী বলেন, পাঁচদিন ধরে বৃষ্টি আর জোয়ারের পানিতে আমরা কার্যত পানিবন্দি। ঘর থেকে বের হওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। জনপ্রতিনিধি কিংবা প্রশাসনের কাউকে এখনো পাশে পাইনি। তবে সমাজকর্মী আবদুর রহমান সোয়েব ও সংবাদকর্মী মেহেদী হাসানের উদ্যোগে এলাকাবাসী স্বেচ্ছাশ্রমে পানি নিষ্কাশনের কাজ করছেন।

ভোলা সদর উপজেলার কয়েকজন রিকশা ও অটোরিকশাচালক জানান, বৃষ্টির কারণে সড়কে যাত্রী কমে যাওয়ায় তাদের দৈনিক আয় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এতে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

এদিকে জলাবদ্ধতায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরাও। কয়েকজন কৃষক জানান, কয়েকদিন আগে আমনের বীজতলায় বীজ বপন করেছিলেন। কিন্তু টানা বর্ষণে বীজতলা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

মনপুরা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আবু মুছা বলেন, যেসব এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে সেগুলো চিহ্নিত করে পানি নিষ্কাশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এরই মধ্যে পানি অপসারণের কাজ শুরু হয়েছে।

মনপুরা প্রথম শ্রেণির আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের পর্যবেক্ষক মাকসুদুর রহমান জানান, বুধবার দুপুর ১২টা থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত মনপুরায় ১০২ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী কয়েকদিনও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে।

ভোলা আবহাওয়া অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষক মাহবুবুর রহমান জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ভোলা সদরে ৫৩ দশমিক ৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। লঘুচাপের কারণে সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর এবং নদীবন্দরে ১ নম্বর সতর্কসংকেত বহাল রয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসাফউদ্দৌলা জানান, বর্তমানে মেঘনা নদীর পানি বিপৎসীমার ১ দশমিক ১৯ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ভবিষ্যতে মনপুরা উপকূলে স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল খননের একটি প্রকল্প গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত