বন্যার পানি কমলেও থামেনি রানু-সেলিনাদের চোখের জল

আপডেট : ১৩ জুলাই ২০২৬, ১২:৫৩ পিএম

প্রকৃতির রুদ্ররূপ শান্ত হয়েছে কিছুটা। আকাশে কালো  মেঘ। তবে উজানে বৃষ্টি কম হওয়ায় খোয়াই  নদীতে পানি কমতে শুরু করেছে। আশ্রয়কেন্দ্র কিংবা প্রতিবেশি উঁচু ঘর ছেড়  নিজ নিজ ভিটায় ফিরতে শুরু করছে মানুষ জন। কিন্তু পানি কমলেই কি আর কষ্ট কমে? বানের পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে লস্করপুর, লামাতাসি আর পইল ইউনিয়নের ৩৫টি গ্রামে এখন কেবলই ধ্বংসস্তূপ আর কাদার আস্তরণ। আর এই কর্দমাক্ত মাটির ওপর দাঁড়িয়ে বুকফাটা আর্তনাদ করছেন শত শত নিঃস্ব মানুষ। তাদেরই একজন হবিগঞ্জ সদর উপজেলার হাতিরথান গ্রামের রানু বেগম।

৯ জুলাই রাতে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে যখন হু হু করে পানি ঢুকছিল এলাকায়, তখনো রানু বেগম বোঝেননি প্রকৃতি তার জন্য কতটা নির্মম হতে যাচ্ছে। পরদিন ১০ জুলাই রাতের তীব্র স্রোতে চোখের পলকে ধসে পড়ে রানুর মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁই ছোট্ট কুঁড়েঘরটি। চার সদস্যের এই সংসারে অভাব ছিল নিত্যসঙ্গী, কিন্তু একটা ছাদ তো ছিল মাথার ওপর! এখন সেই ছাদটুকু হারিয়ে রানু বেগম যেন অথৈ সাগরে পড়েছেন।

নিজের দুঃখের কথা বর্ণনা দিতে গিয়ে রানু বেগম বলেন, আমার ছেলেটা তিন বছর ধইরা বিছানায় পইড়া আছে, কোমরের হাড্ডিতে সমস্যা। বুড়া মাডাও অসুস্থ। নিজের ঘরটা যখন ভাইঙা পড়ল, মনে হইলো আমার দুনিয়াটাই শ্যাষ। সরকার যদি একটু না তাকায়, আমি এই অসুস্থ পরিবার লইয়া কই যামু?

সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি রানুর কিশোরী মেয়ে। পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে একটা কোম্পানিতে সামান্য বেতনে কাজ নিয়েছে সে। সেই যৎসামান্য আয় আর রানু বেগমের অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে যা পায় তা দিয়ে কোনোমতে চলত অসুস্থ ছেলের ওষুধ আর পরিবারের আহার। এখন ঘর হারিয়ে প্রতিবেশীর আশ্রয়ে দিন কাটছে তাদের।

হাতিরথান গ্রামে ঘুরে যা দেখা গেছে, শুধু রানু বেগম নন, এই তালিকায় সেলিনা বেগমসহ আরো অনেকেই আছেন। রেনু বেগমের মতো সেলিনারও শেষ আশ্রয়টুকু বানের পানিতে ভেসে গেছে। স্বামীহারা এই নারীর কাঁধে চার কন্যা সন্তানের দায়িত্ব। চারিদিকে এখন শুধু ভাঙাচোরা ঘর আর থিকথিকে কাদা। চার মেয়েকে নিয়ে এই ভাঙা ভিটেতে কীভাবে আবার নতুন করে জীবন শুরু করবেন, সেই দুশ্চিন্তায় চোখে ঘুম নেই সেলিনার।

টানা বৃষ্টি আর উজানের ঢলে খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছিলেন। বন্যার পানি কমতে থাকায় রাস্তাঘাট, ফসলি জমি আর মাছের ঘের জেগে উঠছে ঠিকই, কিন্তু সেই সঙ্গে ভেসে উঠছে কৃষকের স্বপ্নভঙ্গ আর মৎস্যচাষীদের কোটি টাকার লোকসানের ক্ষতচিহ্ন। ঘরহারা এই মানুষগুলোর এখন একটাই চাওয়া ত্রাণ নয় বরং মাথা গোঁজার মতো একটা টেকসই পুনর্বাসনের।

ক্ষতিগ্রস্থদের তালিকা ও পুনর্বাসনের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. জি এম সরফরাজ জানান, বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ শুরু হয়েছে। আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই প্রকৃত  তালিকা তৈরি করে সরকারিভাবে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা ও পুনর্বাসন সামগ্রী দেওয়া হবে।

প্রশাসনের আশ্বাস যত দ্রুত বাস্তবায়িত হবে রানু ও সেলিনাদের মতো অসহায় মানুষদের চোখের জল তত দ্রুত শুকাবে। কাদা আর ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এই পরিবারগুলো এখন চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে মানবিক সাহায্যের দিকে।

এদিকে, সামগ্রিক বন্যা নিয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মঈনুল হক জানান, সাম্প্রতিক বন্যায় হবিগঞ্জ বানিয়াচং ও বাহুবল উপজেলায় ৬ হাজার ৪৪৫টি পরিবারের প্রায় ১৪ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এ পর্যন্ত সাড়ে ৭ কিলোমিটার সড়ক নষ্ট হয়েছে। ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্থদের মধ্যে ২০ মেট্রিক টন চাল, ২ লাখ টাকা ও ১ হাজার ৭২ প্যাকেট ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।

অপরদিকে, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মো. আখতারুজ্জামান জানিয়েছেন, পানি পুরোপুরিভাবে সরে না গেলে আউশ ধান, আমনের বীজতলা ও শাকসবজি ক্ষেতের কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা নিরুপন করা সম্ভব নয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত