অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেন ও মানিলন্ডারিং (অর্থ পাচার) মামলায় গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর আলোচিত প্রতারক হরিদাস চন্দ্র তরণী দাসকে (৪৫) গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি।
সোমবার (১৩ জুলাই) দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গাইবান্ধার পুলিশ সুপার (এসপি) জসিম উদ্দিন।
তিনি মুঠোফোনে জানান, গতকাল রবিবার (১২ জুলাই) রাত সাড়ে ১১টার দিকে জেলা পুলিশের সহায়তায় ঢাকা থেকে আসা সিআইডির একটি বিশেষ দল অভিযান চালিয়ে পলাশবাড়ীর নয়াপাড়া গ্রাম থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের পরপরই তাকে ঢাকা নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
এসপি আরও জানান, হরিদাসের বিরুদ্ধে ঢাকার উত্তরা পশ্চিম থানায় মানিলন্ডারিং আইনে একটি মামলা রয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, হরিদাস তার বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অবৈধভাবে প্রায় ১০ কোটি টাকা লেনদেন করেছেন, যার কোনো বৈধ উৎস তিনি দেখাতে পারেননি। সেই সুনির্দিষ্ট মামলার ভিত্তিতেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হরিদাসের বাড়ি পলাশবাড়ী উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর নয়াপাড়া গ্রামে। তিনি ওই গ্রামের গোপীনাথ চন্দ্র তরণীর ছেলে। একসময় সংসারে চরম অভাবের কারণে বাঁশের তৈরি ডালি, কুলা ও চালুন বাজারে বিক্রি করতেন তিনি। পরবর্তীতে ঋণগ্রস্ত হয়ে তার বাবা বসতভিটা বিক্রি করে দিলে হরিদাসের চার ভাই ভারতে চলে যান। তার বাবা ও ছোট ভাই বর্তমানে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে বসবাস করছেন।
২০১০ সালের দিকে হরিদাস ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ২০১৮ সালে ঢাকায় এক সবজি বিক্রেতার সাথে সাবলেট বাসায় থাকা শুরু করেন। ২০১৯ সালে তিনি সনাতন ধর্ম পরিবর্তন করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং নিজের নাম পরিবর্তন করে রাখেন 'তাওহীদ ইসলাম'। এই সময়ে তিনি সুমি বেগম নামের এক নারীকে বিয়ে করেন। এরপর ঢাকার উত্তরায় ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে কাজ শুরু করলেও দ্রুতই জড়িয়ে পড়েন বড় বড় প্রতারণায়।
একপর্যায়ে হরিদাস নিজেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবারের 'প্রটোকল অফিসার' হিসেবে পরিচয় দেওয়া শুরু করেন। বিভিন্ন প্রভাবশালী মন্ত্রী ও কর্মকর্তার ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে তিনি চাকরি, কাঙ্ক্ষিত জায়গায় বদলি এবং সরকারি বড় বড় উন্নয়নমূলক কাজের টেন্ডার পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। ২০১৯ সালে তিনি ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া এলাকায় প্রায় এক বিঘা জমি কিনে 'প্যারিস সুইমিংপুল এন্টারটেইনমেন্ট পার্ক' নামে একটি রিসোর্ট নির্মাণ করেন এবং বিত্তশালীদের সেখানে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিজের প্রভাব জাহির করতেন।
এর আগে ২০২২ সালের ৮ নভেম্বর র্যাব-এর একটি যৌথ অভিযানে সহযোগীসহ ঢাকার বনানী থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন হরিদাস। সে সময় সুনির্দিষ্ট মামলা না থাকায় তাকে ৫৪ ধারায় কারাগারে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি অবৈধ উপায়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান।
২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে হরিদাস আবারও দেশে ফিরে আসেন। এবার তিনি নিজের পূর্বের সনাতন ধর্মে ফেরার নাটক করেন এবং এলাকায় এসে 'ধর্ম ও মূর্তির' আড়ালে নতুন করে প্রতারণার জাল বিছান। সম্প্রতি এলাকায় বিতর্কিত এক বিশাল মূর্তি ও মন্দির প্রকল্পের নামে অর্থ আত্মসাৎ ও নানা অপকর্মের অভিযোগে স্থানীয়দের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
তদন্তকারী সংস্থা জানায়, হরিদাস ও তার সহযোগীরা সোনা চোরাচালান চক্রের সাথেও জড়িত ছিলেন। নামে-বেনামে একাধিক ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট খুলে তিনি কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন করেছেন। মূলত অপরাধলব্ধ কালো টাকা বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে বৈধ করার (মানিলন্ডারিং) অপরাধেই এবার সিআইডির জালে ধরা পড়লেন এই বহুরূপী প্রতারক।