এক আসামির মৃত্যুদণ্ড তিনজনের যাবজ্জীবন

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৬, ০৬:৪১ এএম

সিলেটের ঐতিহ্যবাহী এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে স্বামীকে বেঁধে রেখে তরুণী বধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণের মামলায় এক আসামির মৃত্যুদণ্ড এবং তিন আসামির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত। অপরাধ প্রমাণিত না হওয়ায় চারজন আসামিকে খালাস প্রদান করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার আসামিদের উপস্থিতিতে এই রায় ঘোষণা করেন।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হলেন সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলার চান্দাইপাড়ার তাহিদ মিয়ার ছেলে সাইফুর রহমান (২৮)। যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বাগুনীপাড়ার শাহ জাহাঙ্গীর মিয়ার ছেলে শাহ মাহবুবুর রহমান রনি (২৫), সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলার উমেদনগর গ্রামের মৃত রফিকুল ইসলামের ছেলে তারেকুল ইসলাম তারেক (২৮) ও সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার আটগ্রামের মৃত অমলেন্দু লস্কর ওরফে কানু লস্করের ছেলে অর্জুন লস্কর (২৬)। রায়ে খালাস প্রাপ্তরা হলেন সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার বড়নগদীপুরের দেলোয়ার হোসেনের ছেলে রবিউল ইসলাম (২৫), সিলেটের কানাইঘাট উপজেলার লামা দলইকান্দির ছালিক আহমদের ছেলে মাহফুজুর রহমান মাসুম (২৫), সিলেট নগরীর গোলাপবাগ আবাসিক এলাকার মৃত সোনা মিয়ার ছেলে আইন উদ্দিন ওরফে আইনুল (২৬) ও বিয়ানীবাজার উপজেলার নটেশ্বর গ্রামের মৃত ফয়জুল ইসলামের ছেলে মিজবাউল ইসলাম রাজন (২৭)। মামলার আসামিরা বর্তমানে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।

মঙ্গলবার সকালে কঠোর নিরাপত্তায় মামলার আট আসামিকে কারাগার থেকে আদালতে আনা হয়। এরপর সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার মামলার রায় ঘোষণা করেন। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের পিপি আবুল হোসেন জানিয়েছেন, রায়ে আসামি শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, তারেকুল ইসলাম ও অর্জুন লস্করকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি প্রত্যেককে ১ লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড এবং অন্য একটি ধারায় ১৪ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড, ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড এবং জরিমানা অনাদায়ে আরও ৬ মাস করে কারাদণ্ডে দণ্ডিত করেছে আদালত। জরিমানার টাকা ভিকটিমকে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত। 

এই রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন পিপি আবুল হোসেন। তিনি বলেন, মামলায় বিচারক যাদের খালাস দিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে অপরাধের যথাযথ সাক্ষ্য-প্রমাণ মিলেনি। তারপরও আমরা রায় আরও ভালো করে পড়ব। বিচার বিশ্লেষণ করে যদি মনে হয় খালাস পাওয়া আসামিদের বিষয়ে উচ্চ আদালতে যাওয়ার প্রয়োজন আছে, তাহলে আমরা উচ্চ আদালতে যাব।’

তবে রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে আসামি পক্ষের আইনজীবী শাহ মোশাহিদ আলী বলেন, ‘এই মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে কেউ সাক্ষ্য দেয়নি। ভিকটিমও আসামিদের শনাক্ত করেননি। অপরাধ প্রমাণ না হওয়া সত্ত্বেও কয়েকজনকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। আমরা এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে যাব।’

মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় স্বামীর সঙ্গে প্রাইভেটকারযোগে বেড়াতে গিয়েছিলেন এক গৃহবধূ। সন্ধ্যার পরে এমসি কলেজের প্রধান ফটক থেকে ওই দম্পতিকে গাড়িসহ জোরপূর্বক কলেজের ছাত্রাবাসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে স্বামীকে বেঁধে রেখে গৃহবধূকে দলবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়। পরদিন সকালে গৃহবধূর স্বামী বাদী হয়ে শাহপরান থানায় ছাত্রলীগ কর্মী সাইফুর রহমানকে প্রধান আসামি করে ছয়জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও দুজনকে আসামি করে মামলা করেন।

দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনাটি দেশব্যাপী ব্যাপক আলোচনা ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। প্রতিবাদে সরব হয় বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন। ঘটনার পর আসামিরা পালিয়ে গেলেও তিন দিনের মধ্যে ছয় আসামি ও সন্দেহভাজন দুজনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব ও পুলিশ। গ্রেপ্তার আট আসামিকে পাঁচ দিন করে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। পরে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তারা। প্রধান আসামি সাইফুর রহমান, তারেকুল ইসলাম তারেক, শাহ মাহবুবুর রহমান রনি ও অর্জুন লস্কর ধর্ষণের কথা স্বীকার করেন। এ ছাড়া রবিউল ও মাহফুজুর ধর্ষণে সহায়তার কথা স্বীকার করে। সন্দেহভাজন দুই আসামিও জবানবন্দি দেয়। পরে আসামিদের ডিএনএ নমুনা পরীক্ষায় আটজন আসামির মধ্যে ছয়জনের ডিএনএর মিল পাওয়া যায়।

২০২০ সালের ৩ ডিসেম্বর আট আসামির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, শাহপরান থানার তৎকালীন পরিদর্শক ইন্দ্রনীল ভট্টাচার্য। গত বছরের মে মাসে মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন বিচার ট্রাইব্যুনাল থেকে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর হয়। এরপর সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। মামলায় ২৪ জন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের মধ্যে ধর্ষিত গৃহবধূ, তার স্বামী, আসামিদের স্বীকারোক্তি নেওয়া ম্যাজিস্ট্রেট, মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা, এমসি কলেজের অধ্যাপক, ওসমানী হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের চিকিৎসক রয়েছেন।

এ ছাড়া ঘটনার রাতে ছাত্রাবাসে সাইফুর রহমানের কক্ষ থেকে আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে অস্ত্র আইনে আলাদা মামলা দায়ের করা হয়। পরে শাহ মো. মাহবুবুর রহমান রনিকে ওই মামলায় আসামি করা হয়। আর ধর্ষিত নারীর স্বামীর কাছে চাঁদা দাবি ও গাড়ি ছিনতাইয়ের ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে আরেকটি মামলা করে। ২০২১ সালের ১৭ জানুয়ারি অপহরণ ও ধর্ষণ মামলায় অভিযোগ গঠন করে আসামিদের বিচার শুরুর আদেশ দেয় সিলেটের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। পরে দুটি মামলার বিচারকাজ একই আদালতে করার নির্দেশনা চেয়ে উচ্চ আদালতে আবেদন করেছিল বাদীপক্ষ।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় স্বামীর সঙ্গে প্রাইভেটকারে শাহপরান (রহ.) মাজারে বেড়াতে গিয়েছিলেন ওই তরুণী (২০)। ফেরার পথে টিলাগড় এলাকায় এমসি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে গাড়ি থামিয়ে পাশের দোকানে যান স্বামী। এই সময়ে পাঁচ থেকে ছয়জন তরুণ এসে স্বামী-স্ত্রীকে জিম্মি করে প্রাইভেটকারসহ বালুচর এলাকায় এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে নিয়ে যায়। এরপর স্বামীকে মারপিট করে বেঁধে রেখে ওই তরুণীকে ছাত্রাবাসের ভেতরে দলবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়। পরে স্বামীর টাকা ও প্রাইভেটকার রেখে দিয়ে তাদের ছেড়ে দেয় ধর্ষকরা। ছাত্রাবাস থেকে বেরিয়ে নির্যাতিত গৃহবধূর স্বামী ঘটনাটি পুলিশকে জানান। তবে অভিযুক্তরা ছাত্রলীগের কর্মী হওয়ায় প্রথমে ছাত্রাবাসে প্রবেশে গড়িমসি করে পুলিশ। এই সুযোগে ছাত্রাবাস থেকে পালিয়ে যায় ধর্ষকরা। এরপর রাতভর ছাত্রাবাসে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন কক্ষ থেকে অস্ত্র উদ্ধার করে পুলিশ। অভিযুক্তদের এমসি কলেজ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে কলেজ কর্তৃপক্ষ। এরপর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও তাদের ছাত্রত্ব ও সনদপত্র বাতিল করে। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত