কৈশোরে বাবার সঙ্গে শিকারে যেতেন সীতেশ রঞ্জন দেব। তখন বন্যপ্রাণী শিকারে তেমন কোনো বিধিনিষেধ ছিল না। ১৯৮৬ সালে বাবার মৃত্যুর পরও তিনি কিছুদিন শিকার করেন। কিন্তু খুব অল্প সময়েই তার মধ্যে উপলব্ধি হয় প্রাণ হত্যা নয়, প্রাণ রক্ষাই হওয়া উচিত মানুষের প্রধান কাজ। সেই উপলব্ধিই তার জীবন বদলে দেয়। এক সময়ের পাকা শিকারি হয়ে ওঠেন আহত ও বিপণœ বন্যপ্রাণীর অভিভাবক। সেই অভিভাবক গতকাল মঙ্গলবার সকালে চলে গেলেন না ফেরার দেশে। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনের অন্যতম এই পথিকৃৎ প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে পরিচিত ছিলেন ‘সীতেশ বাবু’ নামে।
সীতেশ রঞ্জন শুধু একজন ব্যক্তি ছিলেন না; ছিলেন একটি আদর্শ, একটি আন্দোলন এবং অসংখ্য বন্যপ্রাণীর শেষ আশ্রয়স্থল। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে-লোকালয়ে ঢুকে পড়া, মানুষের নির্যাতনের শিকার হওয়া, বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে আহত, অ্যাসিডে ঝলসে যাওয়া, সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর জখম কিংবা পাচারকারীদের হাত থেকে উদ্ধার হওয়া অসংখ্য বন্যপ্রাণীর শেষ ভরসা ছিল শ্রীমঙ্গলের তার প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। তিনি ছিলেন এই ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান। তার হাত ধরে চিকিৎসা, পরিচর্যা ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে গত কয়েক দশকে হাজার হাজার বন্যপ্রাণী ফিরে গেছে তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থলে।
১৯৪৯ সালের ৯ অক্টোবর শ্রীমঙ্গলের নোয়াগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সীতেশ রঞ্জন। মৃত্যুর সময় তার বয়স হয়েছিল ৭৭ বছর। তিনি আট সন্তানের জনক। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ডায়াবেটিসসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। নিজ বাসায়ই তার চিকিৎসা চলছিল। গতকাল মঙ্গলবার সকালে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে পরিবারের সদস্যরা তাকে নিয়ে হাসপাতালে রওনা হন। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই সকাল ৯টা ৫ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। দুপুরে গ্রামের বাড়িতে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।
বন্যপ্রাণীর আক্রমণ তার মুখটা বদলে দেয়। তখন বন্য শূকর পাত্রখোলা চা বাগানে আদিবাসীদের ফসল খেয়ে ফেলত। আদিবাসীদের ফসল বাঁচাতে গিয়ে ১৯৯১ সালের ১৪ জানুয়ারি তিনি ভালুকের আক্রমণে গুরুতর আহত হন। ভালুক তার চোখ উপড়ে সারা মুখ ক্ষতবিক্ষত করে দেয়। অথচ সেই তিনিই তাদের যতœ করেন! অসুস্থ বিড়াল ধরে নিয়ে এসে দুধ খাওয়ান। শঙ্খচুড় সাপ লোকালয়ে চলে এলে তাকে মারতে না দিয়ে নিরাপদ আশ্রয় দেন। মেছো বিড়াল তার ঘরে-বিছানায় গড়াগড়ি করে। ‘আপনার মুখ জারা ক্ষতবিক্ষত করে দিল, তাদের প্রতি আপনার মনে আক্রোশ হয় না?’ সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি একাধিকবার বলেছেন, ‘জীবের প্রতি মায়া জন্মালে মনে শান্তি আসে।’
উদ্ধার করা আহত প্রাণীদের চিকিৎসা ও পরিচর্যার জন্য শ্রীমঙ্গলের মিশন রোডে নিজের বাড়ির আঙিনায় ছোট্ট একটি প্রাণী সেবাকেন্দ্র গড়ে তোলেন সীতেশ রঞ্জন। পরবর্তী সময়ে সেটি পশ্চিম ভাড়াউড়া এলাকার বাগানবাড়িতে স্থানান্তর করা হয়। সময়ের পরিক্রমায় সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করে সেটিই হয়ে ওঠে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন হিসেবে, যা আজ দেশের অন্যতম পরিচিত বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্র। আর এভাবেই বনবিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিভিন্ন প্রাণী উদ্ধারকারী সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ সবার কাছেই বন্যপ্রাণী উদ্ধারের প্রথম ভরসা হয়ে ওঠেন সীতেশ রঞ্জন। শুধু আহত প্রাণীর চিকিৎসা নয়, বন্যপ্রাণী হত্যা ও পাচার রোধ, পরিবেশ সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতেও তিনি নিরলসভাবে কাজ করেছেন। তার উদ্যোগে অসংখ্য তরুণ-তরুণী বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। প্রকৃতি, বন ও বন্যপ্রাণীর প্রতি তার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, নিরলস শ্রম আর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি তাকে দেশের পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ইতিহাসে অনন্য উচ্চতায় স্থান করে দেয়। মৃত্যুর আগে তিনি তার দুই ছেলে সজল দেব ও সঞ্জিত দেবকে এই কাজে দক্ষ করে তোলেন। দীর্ঘদিন ধরে বাবার অসুস্থতার সময়ে তারাই বন্যপ্রাণী উদ্ধার, চিকিৎসা ও পরিচর্যার দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
শ্রীমঙ্গল চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জহর তরফদার বলেন, ‘মানুষটি ছিলেন পশুপ্রেমী, সঙ্গে মানবপ্রেমীও। তিনি সুখে-দুঃখে, অসুবিধায় মানুষের পাশে থাকতেন। জাতি, ধর্ম, বর্ণ তার কাছে কোনো বিভেদ ছিল না। তিনি আজীবন মানুষ এবং পশুর সেবা করে গেছেন। তার একটি আদর্শ ছিল। তিনি দিনের প্রথম বাজারটি করতেন পশুদের জন্য। তারপরে করতেন পরিবারের জন্য। পশুদের প্রতি এমন মমত্ববোধ কালেভদ্রে দেখা যায়।’
সীতেশ রঞ্জনের প্রয়াণ গভীর শোকপ্রকাশ করেছেন মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরীসহ বিভিন্ন সামাজিক, রাজনৈতিক, পরিবেশবাদী ও প্রকৃতিপ্রেমী সংগঠনের নেতারা। তাদের মতে, সীতেশ বাবুর মৃত্যু শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়, এই মৃত্যু বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। শ্রীমঙ্গলবাসীর বিশ্বাস, মানুষ হিসেবে সীতেশ বাবু বিদায় নিলেও তার প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন এবং তার দেখানো পথ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।