মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংকট আবারও প্রমাণ করেছে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রকাশ্য অবস্থানের চেয়ে নীরবতা অনেক সময় বেশি অর্থবহ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত যত তীব্র হয়েছে, ততই একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে- কোথায় সৌদি আরব?
যে দেশটি বহু বছর ধরে ইরানের প্রধান আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পরিচিত, সেই রিয়াদ এবার আশ্চর্যজনকভাবে যুদ্ধের সামনের সারিতে নেই। বরং তাদের কূটনৈতিক আচরণ বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির সমীকরণ বদলাচ্ছে, আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজের অবস্থান পুনর্র্নিধারণ করছে সৌদি আরব।
যুদ্ধের শুরুতে অনেকেই ধারণা করেছিলেন, সৌদি আরব হয়তো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। রিয়াদ প্রকাশ্যে উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রেখেছে, এমনকি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার জানাজায় প্রতিনিধি দলও পাঠিয়েছে। এটি নিছক সৌজন্য নয়; বরং একটি হিসাবি কূটনৈতিক বার্তা।
এই অবস্থানের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ নিরাপত্তার নতুন বাস্তবতা। সাম্প্রতিক সংঘাতে স্পষ্ট হয়েছে, শুধু ইরান নয়, তার আঞ্চলিক মিত্ররাও সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো ও কৌশলগত স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর সক্ষমতা রাখে। হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা এবং জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের সম্ভাবনা সৌদি অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। অর্থাৎ যুদ্ধের রাজনৈতিক লাভের চেয়ে অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কাই এখন অনেক বেশি।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার সীমাবদ্ধতা। কয়েক দশক ধরে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখিয়েছে, বিপুল অস্ত্র কেনা বা সামরিক চুক্তি কোনো দেশের পূর্ণ নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
সৌদি নেতৃত্ব বুঝতে পেরেছে, আঞ্চলিক সংঘাতের আগুন ছড়িয়ে পড়লে তার প্রথম শিকার হতে পারে তারাই।
সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতাও বদলে গেছে। যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ভিশন ২০৩০ শুধু একটি অর্থনৈতিক কর্মসূচি নয়; এটি সৌদি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রূপান্তরের পরিকল্পনা। পর্যটন, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং নিওম-এর মতো মেগা প্রকল্প সফল করতে হলে প্রয়োজন স্থিতিশীলতা, যুদ্ধ নয়।
দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক সংঘাত সেই স্বপ্নকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিতে পারে।
ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রশ্নও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। মক্কা ও মদিনার অভিভাবক হিসেবে সৌদি আরব মুসলিম বিশ্বের একটি বিশেষ অবস্থান ধরে রেখেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরান নিজেকে পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। ফলে মুসলিম বিশ্বের জনমতও আগের মতো একমুখী নেই। এই বাস্তবতায় প্রকাশ্যে ইসরাইলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা সৌদি নেতৃত্বের জন্য রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
এ কারণেই আজকের সৌদি কূটনীতি সংঘাতের চেয়ে ভারসাম্যকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যগত মিত্র হলেও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি নষ্ট করতে চাইছে না। একই সঙ্গে ইসরাইলের সঙ্গে সম্ভাব্য সহযোগিতার পথও পুরোপুরি বন্ধ করছে না। এটি এক ধরনের “ব্যালান্সিং অ্যাক্ট”- যেখানে লক্ষ্য একটাই, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা।
এই সংকট আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি আর আগের মতো সাদা-কালো নয়। একসময় যে দেশগুলোকে স্থায়ী মিত্র বা স্থায়ী শত্রু হিসেবে দেখা হতো, এখন তারা প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পর্ক পুনর্গঠন করছে। অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা, বিনিয়োগ এবং অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এখন সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
সবশেষে বলা যায়, সৌদি আরবের নীরবতা দুর্বলতার প্রতীক নয়; এটি একটি পরিণত কৌশলগত সিদ্ধান্ত। রিয়াদ বুঝতে পেরেছে, মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি বড় যুদ্ধের কোনো বিজয়ী থাকবে না। তাই তারা এখন এমন এক কূটনৈতিক পথ বেছে নিয়েছে, যেখানে প্রতিপক্ষের সঙ্গে কথোপকথন বজায় রাখা যুদ্ধক্ষেত্রে মুখোমুখি হওয়ার চেয়ে বেশি লাভজনক।
সম্ভবত এ কারণেই আগামী দিনের মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় খবর নতুন কোনো যুদ্ধ নয়; বরং নতুন কোনো সমঝোতা হতে পারে। আর সেই সমঝোতার কেন্দ্রবিন্দুতে সৌদি আরবের এই নীরব, কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কূটনীতিই বড় ভূমিকা রাখবে।
তথ্যসূত্র: এনডিটিভি