হরমুজের পর এবার লোহিত সাগর বন্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান

আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২৬, ০৮:২৬ পিএম

ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় যুক্তরাষ্ট্র হামলা চালালে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ করে দেওয়ার জন্য ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের প্রস্তুত থাকতে বলেছে তেহরান। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত তিনটি সূত্রের বরাত দিয়ে বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

সূত্রগুলোর দাবি, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে এবং সেই বার্তা ইতোমধ্যে হুথি নেতৃত্বের কাছেও পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। তবে বার্তাটি কীভাবে পৌঁছানো হয়েছে কিংবা মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় হামলার হুমকি দেওয়ার আগে না পরে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে—সে বিষয়ে তারা বিস্তারিত জানাননি।

রয়টার্সের মন্তব্য চাওয়ার পরও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং হুথিদের মুখপাত্র তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

হুথিদের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, বাব আল-মান্দেব প্রণালির কাছে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন মোতায়েন করে জাহাজে হামলার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে হুথিরা। ইয়েমেনের হোদেইদাহ ও এডেন উপসাগরসংলগ্ন উঁচু এলাকায় এসব অস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছে এবং এখন শুধু হামলার নির্দেশের অপেক্ষায় রয়েছে তারা।

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি ইতোমধ্যেই কার্যত বন্ধ থাকায় যদি বাব আল-মান্দেব প্রণালি বা লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচলেও হামলা শুরু হয়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের দুটি প্রধান তেল রপ্তানি পথ একযোগে অচল হয়ে পড়বে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে।

হুথিদের ঘনিষ্ঠ সূত্রের ভাষ্য, ইয়েমেনে অবস্থানরত ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর প্রতিনিধিরাই বাব আল-মান্দেব প্রণালি কখন বন্ধ করা হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।

এদিকে, আঞ্চলিক উত্তেজনার নতুন ইঙ্গিত হিসেবে হুথিরা সোমবার সৌদি আরবের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। তাদের অভিযোগ, সৌদি বাহিনী হুথিদের নিয়ন্ত্রণাধীন একটি বিমানবন্দরে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে চার বছর ধরে চলা যুদ্ধবিরতিও ভেঙে যায়।

ঝুঁকি বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান ভেরিস্ক ম্যাপলক্রফট-এর মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক প্রধান বিশ্লেষক টরবইর্ন সলভেদট বলেন, হুথি ও সৌদি আরবের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা এমন এক সময়ে দেখা দিল, যখন অঞ্চলটি আগেই অস্থিতিশীল। তাঁর মতে, সংঘাত যদি লোহিত সাগরের তেল রপ্তানি অবকাঠামো ও জাহাজ চলাচলে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানির একমাত্র বড় বিকল্প পথও হুমকির মুখে পড়বে।

রিয়াদের ঘনিষ্ঠ দুটি আঞ্চলিক সূত্র জানিয়েছে, ইরান ও হুথিদের হুমকিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে সৌদি আরব। তাদের মতে, লোহিত সাগরকে কেন্দ্র করে হুথিরা এখন ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ে কাজ করছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হতো।

জুন মাসে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে হওয়া নাজুক যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর আবারও পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরব পাইপলাইনের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে পাঠাচ্ছে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৭ শতাংশ জ্বালানি এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হচ্ছে। ফলে এই রুটেও হামলা হলে আন্তর্জাতিক তেলবাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে।

একটি আঞ্চলিক সূত্রের মতে, বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করেই যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে ফেলতে চায় ইরান। লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল এবং সৌদি আরবের তেল রপ্তানির পথকে ঝুঁকির মুখে ফেলা সেই কৌশলেরই অংশ।

সূত্রটি আরও দাবি করে, 'এই প্রণালি বন্ধ করা খুব কঠিন নয়। সাধারণ আগ্নেয়াস্ত্র দিয়েও জাহাজ চলাচল ব্যাহত করা সম্ভব। এজন্য অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রয়োজন নেই।'

ইরান হুথিদের তাদের আঞ্চলিক ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ জোটের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। এই জোটে লেবাননের হিজবুল্লাহ এবং ইরাকের শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও রয়েছে। যদিও হুথিরা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতে সরাসরি অংশ নেয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরান দীর্ঘদিন ধরে হুথিদের অস্ত্র, অর্থ ও সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে এবং এ সহায়তার একটি অংশ হিজবুল্লাহর মাধ্যমে পৌঁছানো হয়। তবে তেহরান এ অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করে আসছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত