মশা মারতে বরাদ্দ ২০৭ কোটি

আপডেট : ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৯ এএম

ব্যয় সংকোচন ও বাস্তবমুখী বাজেটের কথা জানিয়ে গতবারের চেয়ে ১৫০০ কোটি টাকা কম বাজেট প্রস্তাব করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। তবে মশক নিধনকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এ খাতে ২০৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে সংস্থাটি। গতকাল বৃহস্পতিবার ডিএনসিসির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেন। সেই বাজেট বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

বাজেট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ডিএনসিসি এবার মশার ওষুধ কেনার জন্য ৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে মশক নিধন কার্যক্রমে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬০ কোটি টাকা, মশক যন্ত্রপাতি ক্রয় বাবদ ৬০ কোটি, মশক নিয়ন্ত্রণের বিশেষ কর্মসূচি এক কোটি, ফগার, হুইল ও স্প্রে মেশিন পরিবহনের জন্য এক কোটি ৫০ লাখ টাকা, ডেঙ্গু মোকাবিলায় পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম ও প্রচারে দুই কোটি এবং ব্লিচিং পাউডার কিনতে দুই কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

সব মিলিয়ে শুধু মশা মারতে ডিএনসিসি এই অর্থবছরে খরচ করবে ২০৭ কোটি টাকা। গত বছর বরাদ্দ ছিল ১৮৮ কোটি টাকা। এর আগের দুই-তিন বছর এ খাতে ১০০ থেকে ১৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। দিন দিন বাজেট বাড়লেও মশার যন্ত্রণা থেকে রেহাই পাচ্ছেন না নগরবাসী। এমন অবস্থায় বাজেট বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে নজরদারি ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সিটি করপোরেশনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

আলাপকালে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, বরাদ্দ বাড়ালেই মশা কমবে এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই। কলকাতার মতো শহর মশা থেকে পরিত্রাণ পেয়েছে। তারা শুধু ওষুধ ছিটিয়ে মশা নিধন করেনি। ওষুধ ছেটানো একটা ক্ষুদ্র পার্ট।

তিনি বলেন, মশক নিধনের সঙ্গে অনেক জিনিস জড়িত। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় জোর দিতে হবে। পরিকল্পনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। ঢাকার ভবনগুলো একটার সঙ্গে আরেকটা লাগোয়া। যতটুকু ফাঁকা রাখার কথা ছিল, তা রাখা হচ্ছে না। এখন দুই ভবনের মাঝখানে মশা জন্ম নিলে সেই মশা নিধন করবেন কীভাবে? তা ছাড়া মশক নিধন খাতে নানা অনিয়ম-দুর্নীতি রয়েছে। ব্যয় সংকোচনের পাশাপাশি সরকারি অর্থ খরচে স্বচ্ছতা নিয়ে আসা জরুরি।

এদিকে এবার জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৩৩ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে নর্দমা/ড্রেন পরিষ্কার ১৬ কোটি টাকা, খাল পরিষ্কারের জন্য ৩৫ কোটি, খাল ও লেক উন্নয়ন ১০ কোটি, পাম্প হাউজের সরঞ্জামাদি ক্রয়, আধুনিকায়ন ও উন্নয়ন ৯ কোটি ৬০ লাখ, ক্লিনিং মেশিন ক্রয় এক কোটি, ১৮টি ওয়ার্ডের সড়ক ও ড্রেনেজ অবকাঠামো উন্নয়ন ১৯ কোটি ৬৮ লাখ টাকা এবং চারটি খাল উন্নয়ন প্রকল্পে ৪২ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয় পরিকল্পনা নির্ধারণ করেছে ডিএনসিসি।

ডিএনসিসি প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বলেন, এবারের বাজেটে ডেঙ্গু মশা নিয়ন্ত্রণসহ মশাবাহিত বিভিন্ন রোগ নিয়ন্ত্রণ করা, নগরের জলাবদ্ধতা প্রতিরোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। আমরা ডেঙ্গুমুক্ত শহর গড়ে তুলতে পারব, পরিচ্ছন্ন নগরী গড়ে তুলতে পারব। সিটি করপোরেশন সর্বদা সব সময় দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা প্রতিদিন প্রতিনিয়ত নগরবাসীর সেবায় নিয়োজিত আছে। শুধু নগরবাসী একটু সচেতন হলেই আমরা আমাদের কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছে যাব।

প্রশাসক বলেন, ঢাকা নগরীর সব কার্যক্রম ও সংস্থা সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত নয়। রাজউক, ওয়াসা ও পিডব্লিউডি জড়িত আছে। আমরা চেষ্টা করছি সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতামুক্ত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নাগরিক জীবন গড়ে তুলতে। এ সময় দায়িত্ব গ্রহণের চার মাসে সিটি করপোরেশনের নানা উন্নয়ন ফিরিস্তি তুলে ধরেন তিনি।

এদিকে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য চার হাজার ৫২৭ কোটি ৭৪ লাখ টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করেছে ডিএনসিসি। সংস্থাটির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান জানান, বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে দুই হাজার ৫৩১ কোটি ৭২ লাখ টাকা, যা মোট আয়ের প্রায় ৫৬ শতাংশ।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় এবার ঢাকা উত্তর সিটির হাতে থাকা অর্থের পরিমাণ (প্রারম্ভিক স্থিতি) কমেছে। গত অর্থবছরে এ স্থিতি ছিল ৮৫০ কোটি টাকা, চলতি প্রস্তাবে তা নেমে এসেছে ৬৬০ কোটি ৪৪ লাখ টাকায়, অর্থাৎ প্রায় ১৯০ কোটি টাকা কম।

প্রস্তাবিত বাজেটের প্রায় ৬৭ শতাংশ, অর্থাৎ তিন হাজার ১৫ কোটি ৪৯ লাখ টাকা উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে সড়ক ও ট্রাফিক অবকাঠামো উন্নয়নে। এ খাতে বরাদ্দ এক হাজার ৩৬৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং উন্নয়ন বাজেটের ৪৫ শতাংশেরও বেশি।

বাজেটে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে নগরীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে। রাজস্ব ও উন্নয়ন দুই খাত মিলিয়ে এ বাবদ মোট বরাদ্দ ৫১১ কোটি ৪১ লাখ টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় ১১ শতাংশ। আর মশক নিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থ্য খাতে মোট বরাদ্দ ২০৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, মোট বাজেটের প্রায় সাড়ে ৪ শতাংশ।

এ ছাড়া কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও পারিশ্রমিক বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৯৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের হোল্ডিং, পরিচ্ছন্নতা, লাইটিং ও স্বাস্থ্য কর খাত থেকে মোট রাজস্ব আয়ের ৪৭ শতাংশ আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে, যা টাকার অঙ্কে ১ হাজার ২১০ কোটি টাকা। এ ছাড়া সম্পত্তি হস্তান্তর কর খাত থেকে ৭৫০ কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৩০ শতাংশ আয়ের প্রাক্কলন করা হয়েছে। অবশিষ্ট অর্থ ট্রেড লাইসেন্স, সড়ক খনন ফি, বিজ্ঞাপন কর, গরুর হাটসহ অন্যান্য খাত এবং সরকারি ও বৈদেশিক অনুদানের মাধ্যমে সংগ্রহের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত