আর্জেন্টিনার স্বপ্ন গুড়িয়ে স্পেন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন

আপডেট : ২০ জুলাই ২০২৬, ০৪:৩১ এএম

ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসির টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বজয়ের এবং আর্জেন্টিনার খেতাব ধরে রাখার সোনালী স্বপ্নকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিল স্পেন। নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালের ১২০ মিনিটের রুদ্ধশ্বাস মহাকাব্যে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বখেতাব নিজেদের করে নিয়েছে স্প্যানিশরা। ২০১০ সালের পর এটি স্পেনের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়। নির্ধারিত ৯০ মিনিট গোলশূন্য থাকার পর অতিরিক্ত সময়ের ১০৬ মিনিটে বদলি খেলোয়াড় ফেররান তোরেসের সেই মহানাটকীয় গোলটিই শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টাইনদের স্তব্ধ করে স্পেনের মাথায় বিশ্বজয়ের মুকুট পরিয়ে দেয়।

‎​ম্যাচের শুরু থেকেই বলের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হোল্ডে রেখে নিখুঁত পাসিং ও হাই-প্রেসিং ফুটবল খেলতে থাকে স্পেন। ম্যাচের মাত্র ৫ মিনিটেই এগিয়ে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিল লা রোহারা। তরুণ তুর্কি লামিন ইয়ামালের পাস থেকে দানি ওলমো হয়ে বল আবার ইয়ামালের পায়ে এলে তার নেওয়া শটটি ডিফ্লেক্ট হয়ে আর্জেন্টিনার জালে জড়াতে যাচ্ছিল। তবে বরাবরের মতোই আর্জেন্টিনার ত্রাতা হয়ে দাঁড়ান গোলরক্ষক এমিলিয়ানো (এমি) মার্তিনেস। চমৎকার রিফ্লেক্সে ডানদিকে ঝাঁপিয়ে বল প্রতিহত করেন তিনি।

‎​৩৯ মিনিটে ওলমোর পাস থেকে মিকেল ওইয়ারসাবালের জোরালো শটও দক্ষতার সাথে রুখে দেন এমি। অন্যদিকে, প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা আক্রমণভাগে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় ছিল। প্রথমার্ধের শেষ দিকে ৪৪ মিনিটে ইনজুরিতে পড়ে মাঠ ছাড়েন আর্জেন্টিনার নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেস, যা দলের রক্ষণকে আরও চাপে ফেলে দেয়। তার স্থলাভিষিক্ত হন অভিজ্ঞ নিকোলাস ওতামেন্দি।


‎​দ্বিতীয়ার্ধে গতি ফেরাতে নিকো গনসালেসের পরিবর্তে লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে মাঠে নামানো হলেও ম্যাচের রাশ স্পেনের হাতেই ছিল। পুরো ম্যাচে স্প্যানিশদের ৬৯ শতাংশ বল দখলের বিপরীতে আর্জেন্টিনার চেনা গতিময় পাল্টা আক্রমণ বা কাউন্টার-অ্যাটাকের কোনো সুযোগই তৈরি হতে দেয়নি স্পেন। মাঝমাঠের চরম ব্যর্থতায় লিওনেল মেসি এবং হুলিয়ান আলভারেস পুরো ম্যাচেই ছিলেন সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।

‎​সময়ের সাথে সাথে উত্তেজনার পারদ চড়তে থাকে। ৫২ মিনিটে মাঠের ভেতর দুই দলের খেলোয়াড়দের হাতাহাতির সূত্র ধরে পারেদেস হলুদ কার্ড দেখেন। ৬৪ মিনিটে ওলমোর দূরপাল্লার শট এবং ৬৭ মিনিটে ইয়ামালের ক্রসে ফেররান তোরেসের জোরালো হেড রুখে দিয়ে আর্জেন্টানদের ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন এমি মার্তিনেস। ৭৭ মিনিটে কুবার্সির ২৫ গজ দূর থেকে নেওয়া বুলেট গতির শটও প্রতিহত করেন তিনি।


‎​ম্যাচের মূল নাটকীয়তা আসে নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষের যোগ করা সময়ে। ৯০+৩ মিনিটে স্পেনের একটি বিপজ্জনক কাউন্টার অ্যাটাক রুখতে গিয়ে স্প্যানিশ ডিফেন্ডার পাউ কুবার্সিকে ফাউল করেন আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার এনসো ফের্নান্দেস। রেফারি তাকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ডের পাশাপাশি লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বহিষ্কার করেন। ১০ জনের দলে পরিণত হওয়া আর্জেন্টিনার ওপর চাপ আরও বাড়ে ৯০+৮ মিনিটে। ডি-বক্সের ঠিক বাইরে থেকে স্পেনের লামিন ইয়ামাল দেয়ালের ওপর দিয়ে চমৎকার এক বাঁকানো ফ্রি-কিক নেন। বলটি জালের কোণায় জড়াচ্ছিল, কিন্তু এমি মার্তিনেস বামদিকে বাজপাখির মতো উড়ে গিয়ে বলটি পোস্টের বাইরে ঠেলে দিয়ে ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে নিয়ে যান।

‎​১০ জন নিয়ে খেলা আর্জেন্টিনার ওপর অতিরিক্ত সময়ের প্রথমার্ধে স্পেনের আক্রমণের সুনামি বয়ে যায়। কোচ লিওনেল স্কালোনি বাধ্য হয়ে আলভারেসকে তুলে নিয়ে ডিফেন্ডার মার্কোস সেনেসিকে নামিয়ে রক্ষণাত্মক '৫-৩-মেসি' ফর্মেশনে চলে যান। ৯৬ মিনিটে নিকো উইলিয়ামস আর্জেন্টিনার জালে বল জড়ালেও স্প্যানিশ মিডফিল্ডার মিকেল মেরিনো কর্তৃক ওতামেন্দি ফাউলের শিকার হওয়ায় ভিএআর পরীক্ষার পর রেফারি গোলটি বাতিল করেন। ১০৩ মিনিটে মেরিনোর আরও একটি বিপজ্জনক হেড পোস্টের সামান্য বাইরে দিয়ে চলে যায়। একের পর এক আক্রমণ রুখতে গিয়ে সাইডলাইনে মেজাজ হারিয়ে হলুদ কার্ড দেখেন আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনিও।

‎​তবে ১০ জনের দল নিয়ে টাইব্রেকারের যে স্বপ্ন মেসিরা দেখছিলেন, তা ভেঙে যায় ১০৬ মিনিটে। অতিরিক্ত সময়ের দ্বিতীয়ার্ধের খেলা শুরু হওয়ার মাত্র ৩৭ সেকেন্ডের মাথায় পেদ্রো পোরোর বাড়ানো দূরপাল্লার নিখুঁত ক্রস হেডের মাধ্যমে ডি-বক্সের ভেতর নামিয়ে দেন নিকো উইলিয়ামস। সেখানে বিদ্যুৎ গতিতে ছুটে এসে ফেররান তোরেস বাম পায়ের জোরালো ভলিতে বল আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমি মার্তিনেসের মাথার ওপর দিয়ে জালের ছাদে আছড়ে ফেলেন (১-০)। পুরো ম্যাচে অতিমানবীয় ১২টি সেভ করা মার্তিনেসের এবার আর কিছুই করার ছিল না।


‎​১-০ গোলে পিছিয়ে পড়ার পর ম্যাচে ফেরার শেষ মরিয়া চেষ্টা চালায় আর্জেন্টিনা। তবে ১০ জনের দল নিয়ে স্পেনের নিখুঁত পাসিং ফুটবলের সামনে তারা পুরোপুরি অসহায় হয়ে পড়ে। ম্যাচের ১১১ মিনিটে ফাউল করার কারণে হলুদ কার্ড দেখেন আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। এই পর্যায়ে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়দের শরীরী ভাষায় স্পষ্ট পরাজয়ের গ্লানি ফুটে উঠছিল।

‎​পুরো ম্যাচে স্পেনের ২০টি শট নেওয়ার বিপরীতে আর্জেন্টিনা একটি শটও অন বা অফ-টার্গেটে নিতে পারেনি। শেষের ১৫ মিনিটে ১০ জন নিয়ে গোল পরিশোধের আপ্রাণ চেষ্টা করেও স্পেনের জমাট রক্ষণ ভেদ করতে পারেনি আলবিসেলেস্তেরা।

‎​রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথেই ফুটবল ক্যারিয়ারের শেষলগ্নে এসে লিওনেল মেসির টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বজয়ের এবং কিংবদন্তিতুল্য বিদায়ের স্বপ্ন মেটলাইফ স্টেডিয়ামের মাটিতেই সমাহিত হয়। আর আর্জেন্টাইন রাজত্বের অবসান ঘটিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের নতুন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হিসেবে উল্লাসে মেতে ওঠে স্পেনের সোনালী প্রজন্ম।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত