নেপালের তিব্বত সীমান্তের অদূরে বিশাল হিমবাহধসের ৩৮ মিনিট পর রসুয়া জেলার আক্রান্ত এলাকার মানুষের মোবাইলে জরুরি সতর্কবার্তা পৌঁছায়। কিন্তু বার্তা পাওয়ার আগেই নেমে আসা হড়পা বান ও পাথরের আঘাতে বহু গ্রাম ও ঘরবাড়ি মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। দেশটির গণমাধ্যম কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, এ ঘটনায় ফের নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নেপাল ও তিব্বতে হিমবাহধসে সৃষ্ট বন্যায় প্রাণহানি বেড়ে ১ হাজার ২৭৩ জনে দাঁড়িয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এনডিআরআরএমএ) জানিয়েছে, দেশটিতে এখন পর্যন্ত ১ হাজার ২৫২টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ রয়েছেন ৪ হাজার ২১৬ জনেরও বেশি। অন্যদিকে তিব্বতে চীনা কর্তৃপক্ষ ২১ জনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে। সেখানে এখনো ৫৪১ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
আলজাজিরার প্রতিবেদনসূত্রে জান গেছে, চীন সীমান্তের কাছে কয়েকটি জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরে সুড়ঙ্গে শত শত শ্রমিক আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলেও ধারণা করা হচ্ছে। ভেতরে আটকেপড়া শ্রমিকদের কাছে পৌঁছাতে দিনরাত উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন উদ্ধারকারীরা।
নেপালের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি রসুয়া জেলা। সেখানকার একটি সুড়ঙ্গের প্রবেশপথে জমে থাকা বিশাল কাদার স্তূপ সরাতে দেখা যায় উদ্ধারকারীদের। সেখানে উপস্থিত নেপালি সেনাবাহিনীর প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তা সঞ্জয় কেসি বলেন, ‘আমরা এখনো আশা করছি, ভেতরে কেউ জীবিত থাকতে পারেন। বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভেতরের জায়গাটি বড়। আমাদের ধারণা, পুরো বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পানিতে তলিয়ে যায়নি।’
নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনরা প্রতিদিন সকালে তাদের প্রিয়জনের কোনো খবর পাওয়ার আশায় উদ্ধার কেন্দ্রগুলোতে জড়ো হচ্ছেন। অনেকের জন্য এই অপেক্ষা হয়ে উঠেছে অসহনীয়।
নিখোঁজ এক প্রকৌশলীর ছেলে প্রতীক রানা বলেন, ‘প্রতিদিন এখানে আসি বাবাকে খুঁজে পাওয়ার আশায়। কিন্তু প্রতিদিন সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে মনে হয়, আমার আশাও ফিকে হয়ে যাচ্ছে। বাবা সবার জন্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আমার কাছে তিনি ছিলেন জীবনের অত্যন্ত মূল্যবান অংশ।’
এদিকে রাজধানী কাঠমান্ডুতে উদ্ধার হওয়া মরদেহ শনাক্তে কাজ করছেন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা। উদ্ধার হওয়া অনেক মরদেহের অবস্থা এমন যে, সেগুলো শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। উল্কি ও গহনার মতো কিছু বিষয় পরিচয় শনাক্তে সহায়তা করলেও অনেক ক্ষেত্রেই তা যথেষ্ট নয়।
বুধবার নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ বলেন, জীবিত কাউকে খুঁজে পাওয়ার অভিযান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি পুনর্বাসন ও পুনর্গঠনের কাজও শুরু করা হবে।
সতর্কবার্তা ও কাঠামোগত দুর্বলতা : কাঠমান্ডু পোস্ট এক প্রতিবেদনে জানায়, হিমবাহধসের পর রসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং ও চিতওয়ান অঞ্চলের মানুষের মোবাইলে সতর্কবার্তা পৌঁছাতে সময় লাগে ৩৮ মিনিট। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের পাঠানো খুদেবার্তায় তাৎক্ষণিকভাবে উঁচু নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে নদীতীরের অনেক বসতি ও অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যায়।
এনডিআরআরএমএর সাবেক প্রধান নির্বাহী অনিল পোখরেল বলেন, ‘নেপালে প্রকৃত অর্থে সমন্বিত কোনো আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা নেই। কেবল কিছু সেন্সর বসানোকেই পুরো ব্যবস্থা বলা যায় না।’