নিকারাগুয়ায় আর নির্বাচন নয়, প্রেসিডেন্ট ওর্তেগার ঘোষণা

আপডেট : ২১ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৬ এএম

নিকারাগুয়ায় আর কোনো জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন দেশটির দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল ওর্তেগা। আগামী বছর তার বর্তমান মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বিরোধীদের ক্ষমতায় আসার সব পথ বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিলেন তিনি।

রবিবার (স্থানীয় সময়) ১৯৭৯ সালের সান্দিনিস্তা বিপ্লবের বার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া ভাষণে ওর্তেগা বলেন, বিরোধীদের আর নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার সুযোগ দেওয়া হবে না। তবে কীভাবে নির্বাচন ব্যবস্থা বাতিল করা হবে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।

৮০ বছর বয়সী ওর্তেগা বলেন, 'সরকার দখল বা ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য এখানে আর কোনো নির্বাচন হবে না।'

তিনি আরও বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত দল কিংবা সোমোজা-সমর্থকদের ক্ষমতায় ফেরার দিন শেষ। আর কখনো নয়।'

গত দুই মাসের মধ্যে এটিই ছিল ওর্তেগার প্রথম জনসমক্ষে উপস্থিতি। ১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত প্রেসিডেন্ট আনাস্তাসিও সোমোজা সরকারের পতন ঘটানো সান্দিনিস্তা বিপ্লবের অন্যতম নেতা ছিলেন তিনি। পরে ১৯৮০-এর দশকে এক দফা প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৭ সাল থেকে টানা ক্ষমতায় রয়েছেন তিনি।

ওর্তেগার এ ঘোষণার বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। তবে ট্রাম্প প্রশাসন এর আগে ওর্তেগার সরকারকে 'স্বৈরতান্ত্রিক শাসন' হিসেবে আখ্যা দিয়ে দেশটির দুই হাজার ৩৫০ জনের বেশি সরকারি কর্মকর্তা ও তাদের স্বজনদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।

নিকারাগুয়ায় সর্বশেষ ২০২১ সালের নির্বাচন ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। ওই নির্বাচনের আগে ওর্তেগা সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধী নেতা, সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ও ব্যবসায়ী নেতাদের গ্রেপ্তার এবং ভিন্নমত দমনের অভিযোগ ওঠে।

গত বছর সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে নিজের ক্ষমতা আরও সুসংহত করেন ওর্তেগা। ওই সংশোধনের আওতায় তার স্ত্রী রোসারিও মুরিয়োকে 'সহ-রাষ্ট্রপতি' (কো-প্রেসিডেন্ট) করা হয় এবং রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে বাড়িয়ে ছয় বছর করা হয়। বর্তমানে সরকার, বিচার বিভাগ এবং সশস্ত্র বাহিনীসহ রাষ্ট্রের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ওর্তেগা দম্পতির হাতে রয়েছে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদ অভিযোগ করেছে, ওর্তেগা ও মুরিয়োর নেতৃত্বে নিকারাগুয়া একটি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে এবং সেখানে ধারাবাহিকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে। ২০১৮ সালে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নির্বাসিত বিরোধী নেতাদের মতে, ওর্তেগার সর্বশেষ ঘোষণা কার্যত নিকারাগুয়ায় দুই ব্যক্তির শাসনকে আরও স্পষ্ট করেছে এবং বিরোধী শক্তির উত্থান নিয়ে সরকারের উদ্বেগও প্রকাশ করেছে।

রাজনৈতিক সহিংসতা পর্যবেক্ষণকারী অলাভজনক সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটা (এসিএলইডি)-এর জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক তিজিয়ানো ব্রেদা বলেন, সামান্য রাজনৈতিক সুযোগ তৈরি হলেও বিরোধিতা শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে, এ আশঙ্কা থেকেই ওর্তেগা ও মুরিয়ো নির্বাচনই বাতিলের পথ বেছে নিয়েছেন। তার ভাষায়, 'প্রহসনের নির্বাচন আয়োজনের পরিবর্তে তারা নির্বাচনী প্রতিযোগিতাই পুরোপুরি তুলে দিতে চাইছেন।'

২০২১ সালে বিরোধী প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার চেষ্টা করে কারাবন্দি হওয়া এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত ফেলিক্স মারাদিয়াগা বলেন, ওর্তেগার এই ঘোষণা শক্তির বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং ভয়ের স্বীকারোক্তি।

তিনি বলেন, 'ওর্তেগা প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন যে, তার প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল গণতান্ত্রিক প্রতিযোগিতার সব পথ বন্ধ করে দেওয়া।'

মানবাধিকারকর্মী সালভাদর মারেঙ্কোর মতে, ২০১১, ২০১৬ ও ২০২১ সালের নির্বাচনেও কার্যত কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না। গত বছরের সাংবিধানিক সংস্কারের মাধ্যমে নিকারাগুয়ায় কার্যত একদলীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিরোধী নেতাদের অধিকাংশই এখন নির্বাসনে।

তার ভাষায়, 'ওর্তেগা জানেন জনগণ তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই সম্ভাব্য নির্বাচনী পরাজয়ের ঝুঁকি এড়াতেই তিনি নির্বাচন ব্যবস্থাই বিলুপ্ত করতে চাইছেন।' 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত