কথাসাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদ তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম আজ। ১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দের এই দিনে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার লাভপুর গ্রামে এক জমিদারবংশে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাল্যকালে বাবাকে হারিয়ে মা ও বিধবা পিসিমার আদর-যত্নে লালিত-পালিত হন তিনি।
১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে স্বগ্রামের যাদবলাল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এন্ট্রান্স পাস করে তিনি কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে আইএ শ্রেণিতে ভর্তি হন। সে সময় মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলন চলছিল। সেই আন্দোলনে যোগ দিয়ে ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি এক বছর অন্তরীণ থাকেন। এর ফলে তার শিক্ষাজীবনের এখানেই সমাপ্তি ঘটে। পরে তিনি পুরোপুরিভাবে কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন এবং আইন অমান্য আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে প্রায় এক বছর কারাবরণ করেন। কারামুক্তির পর কিছুকাল গ্রামে কাটিয়ে ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি স্থায়ীভাবে কলকাতার বাসিন্দা হন এবং সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন।
তারাশঙ্করের প্রথম গল্প ‘রসকলি’সেকালের বিখ্যাত পত্রিকা কল্লোলে প্রকাশিত হয়। এছাড়া কালিকলম, বঙ্গশ্রী, শনিবারের চিঠি, প্রবাসী, পরিচয় প্রভৃতি প্রথম শ্রেণির পত্র-পত্রিকায় তার লেখা প্রকাশিত হয়। তবে রাজনীতি থেকে তিনি একেবারে বিচ্ছিন্ন হননি। একবার তিনি ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।
পরবর্তীকালে তিনি পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভার নির্বাচিত সদস্য হিসেবে আট বছর দায়িত্ব পালন করেন। কর্মজীবনে তিনি কিছুকাল কলকাতায় কয়লার ব্যবসা এবং কিছুকাল কানপুরে চাকরি করেন। ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন।
প্রথম জীবনে কিছু কবিতা লিখলেও কথাসাহিত্যিক হিসেবেই তারাশঙ্করের প্রধান খ্যাতি। বীরভূম-বর্ধমান অঞ্চলের মাটি ও মানুষ, বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষের জীবনচিত্র, স্বাধীনতা আন্দোলন, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক বৈষম্য, ব্যক্তির মহিমা ও বিদ্রোহ, সামন্ততন্ত্র-ধনতন্ত্রের দ্বন্দ্বে ধনতন্ত্রের বিজয় ইত্যাদি তার উপন্যাসের বিষয়বস্ত্ত।
তারাশঙ্কর প্রায় দুশ গ্রন্থ রচনা করেন। সেগুলির মধ্যে চৈতালী ঘূর্ণি, জলসাঘর, ধাত্রীদেবতা, কালিন্দী, গণদেবতা, পঞ্চগ্রাম, কবি, হাঁসুলি বাঁকের উপকথা, আরোগ্য নিকেতন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। তিনি অনেক গল্পও লিখেছেন। বেদে, পটুয়া, মালাকার, লাঠিয়াল, চৌকিদার, বাগদী, বোষ্টম, ডোম ইত্যাদি সাধারণ মানুষের জীবনচিত্র তাঁর গল্পে দক্ষতার সঙ্গে অঙ্কিত হয়েছে। ‘রসকলি’, ‘বেদেনী’, ‘ডাকহরকরা’ প্রভৃতি তাঁর প্রসিদ্ধ ছোটগল্প। তারাশঙ্করের গল্পের সংকলন তিন খন্ডে সাহিত্য সংসদ কর্তৃক প্রকাশিত (১৯৭৭-১৯৭৯) হয়েছে। তাঁর দুই পুরুষ, কালিন্দী, আরোগ্য নিকেতন ও জলসাঘর অবলম্বনে চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে। সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শরৎস্মৃতি পুরস্কার’ ও ‘জগত্তারিণী স্বর্ণপদক’ লাভ করেন। এছাড়া তিনি ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’, ‘সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার’, ‘জ্ঞানপীঠ পুরস্কার’ এবং ‘পদ্মশ্রী’ ও ‘পদ্মভূষণ’ উপাধিতে ভূষিত হন।
বিখ্যাত বাঙালি কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ১৯৭১ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর কলকাতায় মারা যান। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর।