কাল সারারাত বৃষ্টি ছিল।
সকালে ছিল।
এখনো আছে।
আর্জেন্টিনা-সুইজারল্যান্ডের খেলা দেখে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬। সকাল ৭টায় শুরু হয়ে একশ বিশ+মিনিট খেলা হয়েছে। আর্জেন্টিনা জিতেছে। মান্না ফোন করেছিল তখন। আনন্দ প্রকাশ করছে। তার বন্ধু মান্না আর্জেন্টাইন সমর্থক। আরেক বন্ধু তুষার ব্রাজিলিয়ান—তার দল ব্রাজিল। কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে বিদায় হয়ে গেছে। দুঃখজনক সেই বিদায়ের পর ফেসবুকে ফটোকার্ড ছেড়েছিল তুষার, ‘হারলেও ব্রাজিল, জিতলেও ব্রাজিল।’ আরও অনেক নেটিজেন এটা করেছে। মান্না শুধু তুষারের ফটোকার্ডে সান্ত্বনাসূচক কমেন্ট করেছিল, আসলে সেমিফাইনালে উঠতে পারলে তোরা ফাইনালেও উঠতে পারতি, বিশ্বকাপও জিততে পারতি।
তুষার এত নির্মমতা নিতে পারে না, দুই পুঙ্গব নিয়মিত সান্ধ্যভ্রমণ করে একসঙ্গে, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় তুষার মান্নার ছয়টা কল রিসিভ করে নাই, ঘর থেকে বার হয় নাই। ঘরের শত্রু মহিলা বিভীষণ। তুষারের বউ লাভলীও আর্জেন্টাইন সমর্থক। শোকার্ত তুষারের সঙ্গে সকালে আর কথা বলে নাই, মান্নাকে সে জিজ্ঞাসা করেছিল যে, ‘টাউনে কি বৃষ্টি অয় না?’
‘অয়, গুঁড়ি গুঁড়ি।’
‘ইখানো বেশুমার বৃষ্টিরে ভাই। সারারাইত অইছে। অখনো অর, গলিত্ ফানি ঢুকি গেছে।’
ঘুম থেকে উঠেও সেই বৃষ্টি দেখে তার কোনোরূপ স্বস্তিবোধ হয় নাই বা সে বেজার হয়ে পড়ে নাই, চা বানিয়েছে, নাশতার আয়োজন করেছে। ভেতো বাঙালি। তিন বেলা ভাত খায়। সকালে ডিম সেদ্ধ ভাত ঘি মাখিয়ে খায়। খেয়ে উঠে আজকের পত্রিকা দেখেছে : বন্যা ৭ জেলায়, মৃত্যু ৪৪ জনের... ৪৬ লাখ শিশুকে হিসাবের বাইরে রেখে হামের টিকা... মেট্রোরেল যাত্রী নিয়ে এপ্রিলে যাবে কমলাপুরে...।
দুর!
ঘুমের মধ্যে কল দিয়েছিল কেউ?
একজন মাত্র।
সন্ধ্যাতারা।
বহুযুগ পর। কী মনে করে?
কলব্যাক দিল সে। কল যাচ্ছে, সন্ধ্যাতারা ধরল, ‘আপনি বেঁচে আছেন?’
‘বেঁচে আছি।’
‘কেন বেঁচে আছেন?’
‘মরি না, কী করব?’
‘কত বছর ধরে বেঁচে আছেন?’
‘সিক্সটি। ষাট।’
‘ওএমজি। এটা অন্যায়। আপনি কি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন? ম্যাগসেসে পুরস্কার পেয়েছেন? আপনি কেন এতদিন বাঁচবেন?’
‘মরে যাই?’
‘কীভাবে মরবেন?’
‘সেটা এখনো ডিজাইন করি নাই। আর্জেন্টিনা-সুইজারল্যান্ডের খেলা দেখে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।’
‘এখন কী করেন?’
‘দুর্ভোগ দেখি মানুষের। বৃষ্টিতে পানি জমে গেছে গলিতে। গাড়ি রিকশা ক্যাওস বাঁধিয়ে দিয়েছে। একটা মাইক্রোবাস গর্তে পড়ে গেছে। বৃষ্টি ভিজে মানুষ ভিড় করে দেখছে। একটা কুকুর সাঁতরে পানি পার হচ্ছে—ফ্যাশন হাউজ লিলিথের সিঁড়িতে উঠে পড়ল এই। উল্টো দিকের প্রেসে পানি ঢুকেছে। কাগজ ভিজেছে।’
‘খুব মজা পাচ্ছেন?’
‘তা পাচ্ছি। আটতলা থেকে দেখছি।’
‘মৃত্যু থেকে অনেক দূরে থাকার মতো?’
‘কী?’
‘আটতলা থেকে এসব দেখা?’
‘তা না হয়তো।’
‘কী না হয়তো? আমি আপনাকে মেরে রেখে যাই?’
‘তুমি? শিওর! কীভাবে মারবে?’
‘আপনি বলেন?’
‘গলা টিপে মেরে রেখে যেতে পারো। তাতে অবশ্য আমার অনেক বেশি কষ্ট হয়ে যাবে।’
‘আমারও অনেক বেশি কষ্ট হয়ে যাবে। পরিশ্রমের কাজ।’
‘কেন, তুমি জিম করো না?’
‘হা হা হা। তা করি। এক্সট্রা পরিশ্রমের কথা বলছি। আমার আর এসব ব্যাপারে নিজেকে নিয়োগ করতে ভালো লাগে না।’
‘আমারও না। একজন প্রাণায়াম করতে বলল। খুব সহজ ব্যাপার। লম্বা করে দম নিয়ে ধীরে ধীরে ছাড়বেন। আমি বললাম লম্বা করে দম নিতে আমার কষ্ট হয়। আলস্য লাগে।’
‘হ্যাঁ। ছোট ছোট দম নিয়ে বাঁচেন।’
‘কেন? তুমি আমারে মেরে রেখে যাও। আমার ঘরে একটা চাইনিজ কুড়াল আছে, ম্যাশেটি আছে, বল্লম, রামদা, ছুরি, এন্টিকাটার আছে।’
‘আপনার ঘরে তো দেখি অস্ত্রভাণ্ডার আছে। বন্দুক পিস্তল নাই?’
‘আগ্নেয়াস্ত্র নাই। তোমার কি বন্দুক পিস্তল পছন্দ?’
‘নির্ঝঞ্ঝাট ওয়েপন।’
‘আমি কি একটা পিস্তল জোগাড় করে রাখব?’
‘রাখতে পারেন। কখন মরতে চান?’
‘এএসএপি। যদি হয় এখন।’
‘ডান। আপনি পিস্তল জোগাড় করে রাখেন।’
‘পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ।’
‘আমি আসছি।’
সে কল দিল ল্যাংড়া লুকুকে। ল্যাংড়া লুকু ওয়েপন ফড়ে। হেকলার অ্যান্ড কখের একটা ইউএসপি সাপ্লাই দিল। ইউনিভার্সাল সেল্ফ-লোডিং পিস্তল।
সন্ধ্যাতারা কখন আসবে?
সন্ধ্যাতারা তাকে মেরে রেখে যাবে।
বা সে সন্ধ্যাতারাকে মেরে রেখে দিতে পারে।