রূপগঞ্জে সমবায় সমিতি যেন প্রতারণার ফাঁদ

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪১ এএম

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার চনপাড়া পূর্ণবাসনকেন্দ্র এলাকার ৬০ বছরের বৃদ্ধ রহিমা বেগম। বয়সের ভারে যেন শরীর চলে না, চোখেও ঝাপসা দেখেন। ঘরের বারান্দায় বসে পুরনো একটি ফাইলের কাগজপত্র উল্টেপাল্টে দেখছিলেন তিনি। তাতে যতœ করে রাখা রয়েছে কয়েকটি জমা রসিদ, সঞ্চয়পত্রের কপি আর সমবায় সমিতির দেওয়া সদস্যপদ কার্ড। এগুলো একসময় ছিল তার স্বপ্নের দলিল। স্বামী মারা গেছেন অনেক আগেই। আর ছেলে হৃদয় সড়ক দুর্ঘটনায় বেশ কয়েক বছর আগে মারা যান। ছেলের মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ বাবদ পাওয়া ৯ লাখ টাকা জমা রেখেছিল চনপাড়ার আদর্শ সমবায় সমিতিতে। আজ সেই কাগজগুলোই রহিমা বেগমের সর্বস্ব হারানোর সাক্ষী।

রহিমা বেগমের মতো রূপগঞ্জের হাজারো মানুষ একসময় বিশ্বাস করেছিলেন, ব্যাংকের চেয়ে বেশি মুনাফা দিয়ে তাদের ভাগ্য বদলে দেবে এসব সমবায় সমিতি। এ উপজেলায় গত এক যুগে অর্ধশতাধিক সমবায় সমিতি হাজারো গ্রাহকের শতকোটি টাকা হাতিয়ে উধাও হয়ে গেছে। আর এসব সমবায় সমিতির বিরুদ্ধে মামলা করেও মেলে না সুরাহা ও মেলে না টাকা।     

অনুসন্ধানে জানা গেছে, রূপগঞ্জে নিবন্ধন নেওয়া ২১৩টি সমবায় সমিতির মাঝে ১৩৭টি অকার্যকর অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে ৫০টিরও বেশি সমিতি গ্রাহকদের টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে। ‘অল্প সঞ্চয়ে বড় লাভ’-এর লোভে পড়ে কেউ জমি বিক্রি করে, কেউ প্রবাস জীবনের সঞ্চয় ভেঙে, আবার কেউ মেয়ের বিয়ের জন্য জমানো টাকা তুলে দিয়েছেন এসব সমবায় সমিতির হাতে। শুরুর দিকে দুই-একবার মুনাফা জুটলেও একপর্যায়ে গ্রাহকরা টের পান আসলে তারা সর্বস্ব খুইয়ে ফেলেছেন। অফিসের সামনে গিয়ে দেখেন দরজায় তালা মারা, কর্মকর্তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ। 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৩ সালের শেষ দিকে রূপগঞ্জে মায়ের ছায়া সমবায় সমিতি দুই হাজার গ্রাহকের প্রায় ২০ কোটি নিয়ে উধাও হয়ে গেছে। সমিতিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিপুণ দাস সমিতি অফিসে তালা ঝুলিয়ে সটকে পড়েছেন। চনপাড়া পূণর্বাসনকেন্দ্র এলাকার নীলাচল শ্রমজীবী সমবায় সমিতির ম্যানেজার মাইনুদ্দিন খান জয়, কোষাধ্যক্ষ মোহাম্মদ জিকু তিন শতাধিক গ্রাহকের এক কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে। কৃষক দল নেতা ইদ্রিস আলী ও আওয়ামী লীগের সাবেক ইউপি সদস্য ও চনপাড়ার ডন শমসেরের মালিকানায় গড়ে ওঠা আদর্শ সমবায় সমিতির ছয় শতাধিক গ্রাহকের সাড়ে সাত কোটি টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে সমিতির দুই মালিক। কয়েক বছর আগে ভুলতা এলাকায় পুশী মানবিক উন্নয়ন সংস্থা নামে একটি এনজিও গড়ে তোলেন নবী হোসেন নামে এক ব্যক্তি। সমিতির ৩৫০ গ্রাহকের কয়েক লাখ টাকা নিয়ে এনজিওটি উধাও হয়ে গেছে। তারাব পৌরসভার মৈকুলী এলাকায় একতা মাল্টিপারপাস সমবায় সমিতির মালিক বাবু প্রায় দুই শতাধিক গ্রাহকের ৫০ লাখ টাকা নিয়ে পালিয়ে গেছে।

এ ছাড়া বরপা এলাকায় প্রভাতী মাল্টিপারপাস, ভুলতা আবেদ আল হাসান আরডিপি মাল্টিপারপাস, আব্দুল হক সুপার মার্কেটে ফারিস্ট কো-অপারেটিভ ডেভেলপমেন্ট হোম সোসাইটি, নূর ম্যানশনে রিজম ফাইন্যান্স, ডিকে ফাউন্ডেশন মানবিক সংস্থা, ম্যাক্সিম মাল্টিপারপাস সমবায় সমিতি, সবুজ-বাংলা মাল্টিপারপাসসহ অর্ধশতাধিক সমবায় সমিতি হাজার হাজার গ্রাহকের শতকোটি টাকা হাতিয়ে লাপাত্তা হয়ে যায়। সম্প্রতি নবজাগরণ শ্রমজীবী কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড নামে একটি সমবায় সমিতি গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ঋণ পরিশোধের পরও এনজিওটির অসৎ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে গ্রাহকদের নামে-বেনামে মিথ্যা মামলা করে হয়রানি করে আসছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। জীবনের শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে দিশেহারা হয়ে অনেক গ্রাহক থানায় অভিযোগ দিয়েছেন। কেউ আদালতে মামলা করেছেন। অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত অর্থ ফেরত পাননি।

এদিকে অভিযোগ রয়েছে, সমবায় সমিতিগুলোকে নিবন্ধন দেওয়ার পর উপজেলা সমবায় কার্যালয় থেকে এগুলোর কোনো তদারকি করা হয় না। তদারকি না করার সুযোগ নিয়ে সমবায় সমিতিগুলো গ্রাহকদের টাকা নিয়ে উধাও হয়ে যায়।

চনপাড়া পূনর্বাসনকেন্দ্র এলাকার আব্দুল লতিফের ছেলে শাহীন জানান, তিনি নীলাচল শ্রমজীবী সমবায় সমিতিতে প্রতি লাখে ১৫০০ টাকা সুদ দেওয়ার শর্তে সাত লাখ ৪৯ হাজার টাকা সমিতিতে জমা রাখেন। প্রথম ছয় মাস সুদ ঠিকঠাকই পাচ্ছিলেন। যখন আসল টাকা তুলতে যান। সমিতির লোকজন তাকে অপহরণ মামলা দেওয়াসহ নানা হুমকি-ধমকি প্রদান করে।

রূপগঞ্জ উপজেলা সমবায় অফিসার আলমগীর হোসেন ভুঁইয়া বলেন, ‘নিবন্ধিত ২১৩টি সমবায় সমিতির মাঝে কার্যক্রম চালাচ্ছে মাত্র ৭৬টি। বাকিগুলো অকার্যকর। যেসব সমিতি টাকা নিয়ে পালিয়েছে, তাদের ব্যাপারে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত