ফুটপ্রিন্ট বিশ্লেষণে তান্ত্রিক প্রতারণা চক্রের রহস্য উদ্ঘাটন, গ্রেপ্তার ৩

আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৩:৩৪ পিএম

মামলার বাদী ফেসবুকে 'রহমত আলী কবিরাজ' নামের একটি আইডির মাধ্যমে কথিত এক তান্ত্রিকের সঙ্গে পরিচিত হন। স্বামীর পরকীয়া সম্পর্ক দূর করার প্রলোভন দেখিয়ে ওই তান্ত্রিক প্রথমে হাদিয়া বাবদ ১,৫০০ টাকা এবং পরে জালালী কবুতর কেনার অজুহাতে আরও ৩,৫০০ টাকা বিকাশের মাধ্যমে গ্রহণ করে।

পরবর্তীতে জ্বীনের মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের কথা বলে ভুক্তভোগীকে পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ও রসালো মিষ্টি কিনতে এবং ইমু ভিডিও কলে তার নির্দেশনা অনুযায়ী তা ব্যবহার করতে বলে। নির্দেশনা অনুসরণ করলে রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে ভুক্তভোগীর বাম হাতের তালুতে গুরুতর ক্ষত সৃষ্টি হয়। পরে ক্ষত সারিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিকাশ ও নগদের মাধ্যমে আরও ১৬,০০০ টাকাসহ সর্বমোট ২১,০০০ টাকা প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাৎ করে।

এ ঘটনায় ভুক্তভোগী মোছা. সালমা আক্তার বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে খিলক্ষেত থানায় সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ২২(২) ধারায় মামলা করেন। পরবর্তীতে পিবিআই এসআইঅ্যান্ডও (উত্তর) স্ব-প্রণোদিত হয়ে মামলাটির তদন্তভার গ্রহণ করে এবং এসআই (নিঃ) মো. নাজমুল হক’কে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে নিযুক্ত করা হয়।

পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মো. মোস্তফা কামাল এর সার্বিক দিক-নির্দেশনায় পিবিআই এসআইএন্ডও এর বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ফজলে এলাহী এর তত্ত্বাবধানে ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শিবলী নোমান, এসআইএন্ডও- উত্তর এর সহযোগীতায় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তথ্য-প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অবস্থান শনাক্ত করে।

তদন্তকারী কর্মকর্তা গত ২৪ জুলাই রাত আনুমানিক ১২টায় কুমিল্লা জেলার চান্দিনা থানাধীন হাড়িখোলা বিলের বাড়ি এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে অহিদ মিয়া ওরফে কুয়েত (২৪) এবং মাহে আলমকে (২৭) গ্রেপ্তার করেন। তাদের হেফাজত থেকে প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত মোবাইল ফোন ও সিম কার্ড জব্দ করা হয়।

একই দিন সকাল আনুমানিক ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে নোয়াখালী জেলার সুধারাম থানাধীন পূর্ব এওজবালিয়া গ্রামে অভিযান পরিচালনা করে মো. হাসান আলীকে (২০) গ্রেপ্তার করা হয়। তার হেফাজত থেকেও প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোন এবং একাধিক সিম কার্ড উদ্ধার করা হয়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তাররা প্রতারণার মাধ্যমে ভুক্তভোগীর অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি স্বীকার করে। পরবর্তীতে আদালতে গ্রেপ্তারকৃত অহিদ মিয়া ওরফে কুয়েত (২৪) এবং মো. হাসান আলী (২০) ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

পিবিআই এর তদন্ত এবংগ্রেপ্তারকৃত আসামিদের জবানবন্দি থেকে জানা যায়, তারা একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের সক্রিয় সদস্য। চক্রটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে 'তান্ত্রিক কবিরাজ', 'হোসেন কবিরাজ', 'আসমা কবিরাজ' এবং 'রহমত আলী কবিরাজ' নামে ভুয়া ফেসবুক আইডি ও ইমু অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে তান্ত্রিক পরিচয়ে ভুক্তভোগীসহ বিভিন্ন নারীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করত।

এরপর তারা পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ও রসালো মিষ্টি একসঙ্গে হাতের তালুতে, নাভিতে নিয়ে কিছুক্ষণ ধরে রাখতে নির্দেশ দিত। এর ফলে সংঘটিত রাসায়নিক বিক্রিয়ায় ভুক্তভোগীদের হাতে/নাভিতে গুরুতর ক্ষত সৃষ্টি হতো। পরে ওই ক্ষত জ্বীনের মাধ্যমে সারিয়ে দেওয়ার আশ্বাস এবং জ্বীনের ভয় দেখিয়ে বিকাশ ও নগদ অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অর্থ আদায় করে প্রতারকরা ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিত।

আর্থিক লেনদেন বিশ্লেষণে প্রতারণার মাধ্যমে আদায়কৃত অর্থের একটি অংশ অহিদ মিয়া ওরফে কুয়েতের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে স্থানান্তরের প্রমাণ পাওয়া যায়। এছাড়া মাহে আলম তার নিজ জাতীয় পরিচয়পত্রে নিবন্ধিত বিকাশ সিম ব্যবহার করে প্রধান অভিযুক্তকে প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে সহায়তা করতেন।

তদন্তে আরও জানা যায়, প্রতারক চক্রটি পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও একই ধরনের ভুয়া ফেসবুক পেজ পরিচালনা এবং ভারতীয় মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করত। বিভিন্ন সমস্যা সমাধান ও তদবিরের নামে অর্থ গুগল পে এর মাধ্যমে গ্রহণ করে পরবর্তীতে হুন্ডির মাধ্যমে তারা সেই অর্থ বাংলাদেশে এনে আত্মসাৎ করত।

তদন্তে আরও জানা যায়, প্রতারক চক্রটি তাদের পরিচালিত ভুয়া ফেসবুক পেজগুলো অধিকসংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে বিভিন্ন অ্যাড এজেন্সির মাধ্যমে নিয়মিত বুস্টিং করত, যাতে তান্ত্রিক সেবার প্রচারণা ছড়িয়ে দিয়ে নতুন নতুন ভুক্তভোগীকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলতে পারে।

পিবিআইর তদন্তে আরও জানা যায়, পটাশিয়াম পারম্যাঙ্গানেট ও রসালো মিষ্টির রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলে ভুক্তভোগীরা দগ্ধ হন। জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক মাস ধরে একই ধরনের রাসায়নিক ক্ষত নিয়ে অন্তত ২০০ জন ভুক্তভোগী গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন।

এ বিষয়ে পিবিআই, এসআইএন্ডও এর বিশেষ পুলিশ সুপার মো. ফজলে এলাহী বলেন, প্রযুক্তির অপব্যবহার করে ধর্মীয় বিশ্বাস, কুসংস্কার ও মানুষের আবেগকে পুঁজি করে প্রতারণাকারী সংঘবদ্ধ চক্রের বিরুদ্ধে পিবিআই জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছে। এ ধরনের অপরাধ দমনে আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং জড়িত সকলকে আইনের আওতায় আনা হবে।

তিনি আরও বলেন, সাধারণ মানুষকে অনুরোধ করব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত কথিত তান্ত্রিক, কবিরাজ বা অলৌকিক সমস্যা সমাধানের প্রলোভনে বিভ্রান্ত না হয়ে সচেতন থাকুন এবং প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অবহিত করুন। মামলার সঙ্গে জড়িত অন্যান্য সহযোগীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। মামলার তদন্তও চলমান রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত