ইন্টারনেটের মতো প্রকল্প বাস্তবায়নেও ধীরগতি

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:০৮ এএম

ইন্টারনেটের ধীরগতির জন্য বহুদিন ধরে সমালোচনায় থাকা রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল অপারেটর টেলিটকের প্রকল্প বাস্তবায়নেও রয়েছে ধীরগতি। এতে করে সেবার মানোন্নয়নে ঘাটতির পাশাপাশি দ্রুত পরিবর্তনশীল টেলিযোগাযোগ প্রযুক্তিতে শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদন এবং কমিশন সূত্রে জানা যায়, ৭৫৭ কোটি টাকার ‘৩জি প্রযুক্তি চালুকরণ এবং ২.৫জি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ’ প্রকল্পটি ২১ মাসে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সময় লেগেছে ৫১ মাস। ‘গ্রাম পর্যায়ে টেলিটকের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং ৫জি সেবা প্রদানে নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন’ নামের আরেক প্রকল্প ২৪ মাসে বাস্তবায়নের কথা থাকলেও দুই দফায় সময় বাড়িয়ে ৪৮ মাস করা হয়। এরপরেও অর্ধেক কাজও শেষ হয়নি। উন্নত দেশগুলো যেখানে ৬জি চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে, সেখানে টেলিটকের ৫জি সম্প্রসারণের কাজই এখনো শেষই হয়নি। সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রয়োজনীয় সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ছাড়াই টেলিটকের ‘৩জি প্রযুক্তি চালুকরণ এবং ২.৫জি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ’ প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। ২০১৭ সালে এতে অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। শুরুতে মূল ব্যয় ছিল ৭৭৮ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ছিল ৬৪৪ কোটি ৯৭ লাখ ৬৭ হাজার টাকা এবং টেলিটকের নিজস্ব তহবিল থেকে ১১৩ কোটি ৮৭ লাখ ৪৬ হাজার টাকা। প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ২০১৭ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৮ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত থাকলেও পরে সংশোধন করে মেয়াদ ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। বাস্তবে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এবং শেষ হয় ২০২১ সালের জুনে। শেষ পর্যন্ত ৭৫৭ কোটি ১৮ লাখ ৮২ হাজার টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড (টিবিএল)।

টেলিটকের ৩জি নেটওয়ার্ক উপজেলা সদর, গ্রোথ সেন্টার, প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অন্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সম্প্রসারণের মাধ্যমে সেবার পরিধি বাড়ানোই ছিল প্রকল্পের লক্ষ্য। এ ছাড়া এম-গভর্নেন্স, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন মূল্য সংযোজন সেবা সম্প্রসারণে সহায়ক উচ্চগতির ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার লক্ষ্যের কথাও বলা হয়েছিল। তবে আইএমইডির প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্পের ডিপিপি প্রণয়নে পরিকল্পনাগত দুর্বলতা ছিল। বিভিন্ন মাইলফলক অর্জনের জন্য বাস্তবসম্মত সময় নির্ধারণ করা হয়নি। একই সঙ্গে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও এক্সিট প্ল্যানের অনুপস্থিতি পরিকল্পনা প্রণয়নের দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। এর প্রভাব প্রকল্প বাস্তবায়নেও পড়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ শেষ না হওয়ায় দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি হয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ে সেবা জনগণের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও প্রতিযোগিতামূলক টেলিযোগাযোগ বাজারে টেলিটক কাক্সিক্ষত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। অন্য মোবাইল অপারেটরের তুলনায় প্রতিষ্ঠানটির অগ্রগতি ধীর হওয়ায় গ্রাহক হারানোর ঝুঁকি এবং বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দেশের সব এলাকায় গ্রাহক সস্তুষ্টির মাত্রাও সমান নয়।

আইএমইডি বলছে, গ্রামীণ এলাকায় টেলিটকের ব্রডব্যান্ড ও উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা সম্প্রসারণ এখনো সীমিত। অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক গ্রামীণ অঞ্চলে উচ্চগতির ইন্টারনেট পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। ফলে শহর ও গ্রামের মধ্যে ডিজিটাল সেবার বৈষম্য পুরোপুরি দূর করা যায়নি এবং প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য পূর্ণমাত্রায় অর্জিত হয়নি।

প্রযুক্তি হস্তান্তর ও প্রযুক্তি হালনাগাদের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতাকেও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইএমইডি। প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ ও স্থানান্তরে বাধা থাকলে ভবিষ্যতে সেবার আধুনিকায়ন ব্যাহত হবে এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টেলিটকের অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) সবশেষ হিসাব (মে ২০২৬) অনুযায়ী, দেশে মোট মোবাইল সিম গ্রাহকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮ কোটি ৮৬ লাখ। এর মধ্যে গ্রামীণফোনের গ্রাহক ৮ কোটি ৫৯ লাখ, রবির ৫ কোটি ৮১ লাখ ৮০ হাজার, বাংলালিংকের ৩ কোটি ৭৭ লাখ ১০ হাজার এবং টেলিটকের ৬৮ লাখ ১০ হাজার। অর্থাৎ মোট মোবাইল গ্রাহকের মাত্র ৩ দশমিক ৬ শতাংশ টেলিটকের, আর বাকি ৯৬ দশমিক ৪ শতাংশ গ্রাহক ব্যবহার করছেন বেসরকারি মোবাইল অপারেটরগুলোর সেবা।

টেলিটকের চলমান ‘গ্রাম পর্যায়ে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং ৫জি সেবা প্রদানে নেটওয়ার্ক আধুনিকায়ন’ প্রকল্পের গতি নিয়েও তৈরি হয়েছে হতাশা। প্রকল্প পরিচালক এ এম আখতারুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে জানান, প্রকল্পটি গত বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। পরে এর মেয়াদ ২৪ মাস বাড়িয়ে আগামী বছরের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পের অগ্রগতি প্রায় ৬৫ শতাংশ। দীর্ঘসূত্রতার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি এ প্রকল্পে ছয় মাস হলো যুক্ত হয়েছি। এর আগে কী কী কারণে দেরি হয়েছে তা বলতে পারছি না। তবে পরিকল্পনা কমিশন যেহেতু সময় বাড়িয়েছে সেটা চিন্তাভাবনা করে বাস্তবসম্মত কারণেই করেছে মনে করি।’ নতুন করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাকি কাজ শেষ হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রকল্পে অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। তবে আমরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’

এসব বিষয়ে বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘টেলিটকের অধিকাংশ প্রকল্পের সুফল খুব কম গ্রাহকের কাছে পৌঁছায়। বর্তমানে ৩জি প্রযুক্তি বন্ধ হয়ে ৪জি নেটওয়ার্ক চালু হয়েছে। ফলে ৩জি-সংশ্লিষ্ট যে প্রকল্পগুলো শেষ হয়েছে, সেগুলো এখন মানুষের তেমন উপকারে আসছে না।’

তিনি বলেন, টেলিটকের ২জি সম্প্রসারণ প্রকল্পগুলো মূলত হাওর, পার্বত্য ও নদীবেষ্টিত দুর্গম এলাকায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। তবে এসব এলাকায় টেলিটকের গ্রাহক খুবই কম। এতে করে প্রকল্পগুলোর সুফল সম্ভাব্য গ্রাহকদের বড় একটি অংশ পাচ্ছে না। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকসংখ্যাও প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না।

মহিউদ্দিন আহমেদের মতে, টেলিটকের কাঠামোগত সমস্যাও রয়েছে। পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব এবং যোগ্য নেতৃত্বের ঘাটতির কারণে প্রতিষ্ঠানটি কাক্সিক্ষতভাবে এগোতে পারছে না। তিনি বলেন, ‘কেন প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ হচ্ছে না, সে বিষয়ে জবাবদিহি থাকা উচিত। কারণ এসব প্রকল্প জনগণের অর্থেই বাস্তবায়ন করা হয়।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত