মানসিক ব্যাধি নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড

তিন সন্তানকে হত্যার দায়ে যুক্তরাষ্ট্রে মায়ের বিচার শুরু

আপডেট : ২৮ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৯ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যে ২০২৩ সালে নিজ হাতে তিন শিশু সন্তানকে নৃশংসভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত মা লিন্ডসে ক্ল্যান্সির চাঞ্চল্যকর মামলার বিচারকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে। গতকাল সোমবার প্লিমথ কাউন্টি সুপিরিয়র কোর্টে জুরিদের সামনে প্রসিকিউশন ও বিবাদী পক্ষের উদ্বোধনী যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে এই শুনানির সূচনা হয়।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ৩৫ বছর বয়সী সাবেক প্রসূতি নার্স লিন্ডসে ক্ল্যান্সি স্বীকার করেছেন যে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসে বস্টনের শহরতলি ডাক্সবারির নিজ বাসভবনের বেজমেন্টে ব্যায়ামের ফিতা (এক্সারসাইজ ব্যান্ড) দিয়ে পেঁচিয়ে তিনি তার তিন সন্তান, পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে কোরা, তিন বছর বয়সী ছেলে ডসন এবং মাত্র ৮ মাস বয়সী শিশু ক্যালানকে হত্যা করেন। এরপর তিনি ধারালো ছুরি দিয়ে নিজের শরীরে আঘাত করেন এবং আত্মহত্যার উদ্দেশে দোতলার জানালা থেকে লাফ দেন। তবে এই ব্যর্থ চেষ্টায় তিনি অলৌকিকভাবে বেঁচে গেলেও চিরতরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত (প্যারালাইজড) হয়ে পড়েন।

আসামিপক্ষের যুক্তি: 'পোস্টপার্টাম সাইকোসিস' ও মানসিক বিভ্রম

আদালতে শুনানির উদ্বোধনী বক্তব্যে আসামিপক্ষের প্রধান আইনজীবী কেভিন রেডিংটন দাবি করেন, এটি কোনো পরিকল্পিত খুন নয়। তিনি জানান, লিন্ডসে তার তৃতীয় সন্তান জন্মের পর থেকেই দীর্ঘদিন ধরে তীব্র প্রসূতিপরবর্তী মানসিক সমস্যায় (পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন ও সাইকোসিস) ভুগছিলেন।

রেডিংটন বলেন, এই নারী যখন নিচে বেজমেন্টে নামছিলেন, তখন তিনি মারাত্মক মানসিক বিভ্রম বা সাইকোসিসে ভুগছিলেন।" তিনি লিন্ডসেকে একজন অত্যন্ত মমতাশীল মা হিসেবে চিত্রিত করে বলেন, ঘটনার আগে থেকেই লিন্ডসে ক্রমাগত আত্মহত্যার চিন্তা ও প্রসূতিপরবর্তী মানসিক যন্ত্রণায় জর্জরিত ছিলেন। সুস্থতার আশায় তিনি একাধিক চিকিৎসকের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন এবং তাকে একাধারে অনেক ওষুধ দেওয়া হলেও কোনো চিকিৎসাতেই কাজ হয়নি। আইনজীবী বলেন, তিনি নিজের বানানো নরকে বাস করছেন এবং সন্তানদের সঙ্গে কী ঘটেছে তা তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছেন।

প্রসিকিউশনের পাল্টা দাবি: 'পরিকল্পিত ও স্বার্থপর সিদ্ধান্ত'

অন্যদিকে, সহকারী জেলা অ্যাটর্নি শ্যানান বাকিংহাম বলেন, ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হাসপাতালের সাবেক প্রসূতি নার্স লিন্ডসে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছিলেন। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এটি নারীদের মানসিক স্বাস্থ্য বা আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা নারীদের কীভাবে চিকিৎসা করে তা নিয়ে সামাজিক বিতর্কের কোনো জায়গা নয়। মূল প্রশ্ন হলো— আসামী কি বুঝতে পেরেছিলেন যে সন্তানদের হত্যা করা অপরাধ? তিনি তা জানার পরও সচেতনভাবে হত্যার পথ বেছে নিয়েছিলেন।

প্রসিকিউটর বাকিংহাম আদালতে প্রমাণ উপস্থাপন করে বলেন, ঘটনার দিন লিন্ডসে তার স্বামী প্যাট্রিককে রাতের খাবার কিনে আনতে রেস্তোরাঁয় পাঠান। স্বামী বাইরে যাওয়ার পর ফিরে আসতে কতটুকু সময় লাগবে, তা লিন্ডসে আগে থেকেই মোবাইল ফোনের ম্যাপে হিসেব করে নেন। এরপর অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ও সুনির্দিষ্ট উদ্দেশে নিজের তিন সন্তানকে হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেন।

বাকিংহাম আরও বলেন, তিনি এমন একটি জীবন থেকে পালাতে চেয়েছিলেন যা তিনি আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলেন না। যখনই তিনি সেই সুযোগ পেলেন, নিজের জীবন নেওয়ার আগে স্বার্থপরের মতো কোরা, ডসন ও ক্যালানের জীবন কেড়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

প্রাক্তন স্বামীর আবেগঘন সাক্ষ্য

মামলার প্রথম সাক্ষী হিসেবে আদালতে সাক্ষ্য দেন লিন্ডসের প্রাক্তন স্বামী প্যাট্রিক ক্ল্যান্সি (ঘটনার পর তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে)। তিনি জানান, ঘটনার মাত্র দুই সপ্তাহ আগে একটি মানসিক হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে লিন্ডসে বাড়ি ফেরেন। তবে পরবর্তী দিনগুলোতে তার আচরণে এমন কোনো লক্ষণ ছিল না যে তিনি নিজ বা সন্তানদের ক্ষতি করতে পারেন। খাবার কিনতে যাওয়ার সময়ও তার আচরণ স্বাভাবিক ছিল।

প্যাট্রিক আবেগজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমি ওপরে গেলাম, ছোট ক্যালানকে এক মুহূর্তের জন্য কোলে নিয়ে দোলালাম, কোরোর কপালে চুমু দিয়ে বললাম— আমি এখনই ফিরে আসছি।

তবে রেস্তোরাঁ থেকে ফিরে এসে তিনি মর্মান্তিক দৃশ্যের মুখোমুখি হন। প্রসিকিউটর জানান, প্যাট্রিক ফিরে এসে স্ত্রীকে বাড়ির উঠানে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পান। তিনি ৯১১-এ ফোন করেন। জরুরি উদ্ধারকর্মীরা আসার পর বেজমেন্টে সন্তানদের নিথর দেহ উদ্ধার করা হলে প্যাট্রিক কান্নায় ভেঙে পড়েন।

সম্ভাব্য সাজা

প্রথম মাত্রার হত্যাকাণ্ডের (First-Degree Murder) অপরাধ প্রমাণিত হলে লিন্ডসে ক্ল্যান্সিকে আমৃত্যু প্যারোলহীন কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে বহু আলোচিত এই মামলার বিচারপ্রক্রিয়া আগামী ৬ থেকে ৮ সপ্তাহ স্থায়ী হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত