কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী দিয়ে তিনটি বসতঘর ভাঙচুর করে গুঁড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ সময় ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যরা বাধা দিলে নারী-পুরুষসহ তিনজনকে মারধর করে গুরুতর আহত করা হয়।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে ভুক্তভোগী পরিবার।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগীদের পক্ষে আব্দুল মতিন সাজু বাদী হয়ে একই ইউনিয়নের মৃত আব্দুল গণির ছেলে আমিনুল হক তুহিনকে প্রধান আসামি করে ১৫ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ৪০–৫০ জনের বিরুদ্ধে চৌদ্দগ্রাম থানায় মামলা দায়ের করেন। ঘটনার পর থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। বর্তমানে ঘটনাস্থলে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
চৌদ্দগ্রাম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. আরিফ হোসাইন ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানিয়েছেন, মামলার আসামিদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
থানায় দায়ের করা মামলা সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে উপজেলার বাতিসা ইউনিয়নের বাতিসা গ্রামের মৃত আব্দুল গণির ছেলে আমিনুল হক তুহিন গংদের সঙ্গে ভুক্তভোগী আব্দুল মতিন সাজুদের জমি সংক্রান্ত বিরোধ চলে আসছিল। এরই জেরে গত শনিবার বিকেলে প্রধান অভিযুক্ত আমিনুল হক তুহিন পূর্বপরিকল্পিতভাবে বহিরাগত সন্ত্রাসী এনে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আব্দুল মতিন সাজু ও তার ভাইদের তিনটি টিনশেড ঘর, বাড়ির টিনের সীমানাপ্রাচীর, ঘরে থাকা মূল্যবান আসবাবপত্র ভাঙচুর, গুরুত্বপূর্ণ দলিল-দস্তাবেজ, নগদ অর্থ, দামি জিনিসপত্র, মোবাইল ফোন ও স্বর্ণালঙ্কার (৪ ভরি ওজন) লুটপাট করেছে। এতে ২০ লক্ষাধিক টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে।
হামলার ঘটনায় নারীসহ অন্তত তিনজন আহত হয়েছেন। আহতরা হলেন— ভুক্তভোগী আব্দুল মমিন সুজন, আব্দুল মতিন সাজু ও সাজুর স্ত্রী শারমিন আক্তার। স্থানীয়দের সহযোগিতায় আহতদের উদ্ধার করে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে গুরুতর আহত সুজন ও সাজুকে উন্নত চিকিৎসার জন্য কুমিল্লায় পাঠানো হয়েছে।
এদিকে আকস্মিক সন্ত্রাসী হামলায় বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় তিনটি পরিবার অসহায় অবস্থায় খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবনযাপন করছে। অবিলম্বে প্রধান অভিযুক্ত আমিনুল হক তুহিনসহ হামলার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা।
এ ব্যাপারে ভুক্তভোগী আব্দুল মতিনের বৃদ্ধ মা ছেনোয়ারা বেগম সাংবাদিকদের জানান, ‘ঘটনার দিন আমরা দাওয়াতে গিয়েছিলাম। গত শনিবার মাদক ব্যবসায়ী তুহিনের নেতৃত্বে কমপক্ষে ১০০ জন সন্ত্রাসী প্রকৃতির লোকজন আমার বাড়িতে অতর্কিত হামলা চালিয়ে আমার তিন ছেলের বসতঘর ভাঙচুর করে। এ সময় হামলাকারীরা ঘরে থাকা আসবাবপত্র, নগদ অর্থ, মূল্যবান কাগজপত্রসহ ৪ ভরি স্বর্ণালঙ্কার লুট করে নিয়ে যায়। এতে ২০ লক্ষাধিক টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। খবর পেয়ে আমরা বাড়িতে আসলে তারা দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আমাদের ওপরও হামলা করে। এতে আমার দুই ছেলে আব্দুল মমিন, আব্দুল মতিন এবং পুত্রবধূ শারমিন গুরুতর আহত হন। আমি অবিলম্বে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।’
গুরুতর আহত শারমিন আক্তার বলেন, ‘এ বাড়িতে বিয়ে হওয়ার পর থেকেই মাদক ব্যবসায়ী তুহিনের অত্যাচারে আমরা অতিষ্ঠ। গত দেড় বছরে তুহিনের নেতৃত্বে আমাদের ওপর অন্তত তিনবার হামলা হয়েছে। তাদের এমন অত্যাচার-অনাচারে আজ আমরা জর্জরিত। আমার স্বামীকে বাঁচাতে গিয়ে ওইদিন আমিও হামলার শিকার হয়েছি। আমার একটি হাত ভেঙে গেছে। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তির দাবি করছি।’
এ বিষয়ে আহত আব্দুল মমিন সুজন বলেন, ‘আমার বাবা ১৯৯৬ সালে উক্ত জায়গা ক্রয় করেছেন। এরপর থেকে প্রায় ২০ বছর ধরে আমরা এ জায়গায় বাড়িঘর নির্মাণ করে তিন ভাই বসবাস করছি। ৫ আগস্ট ২০২৪ সরকার পরিবর্তনের পর এ পর্যন্ত তিনবার হামলা করে আমাদের বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। আমাদেরও মারধর করে আহত করা হয়েছে। সর্বশেষ গত ২৫ জুলাই শনিবার বিকেলে বহিরাগত সন্ত্রাসী দিয়ে আমাদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দিয়ে সেখান থেকে উচ্ছেদ করে দেওয়া হয়েছে। আমি বাধা দিলে আমাকেও এলোপাতাড়ি কুপিয়ে আহত করা হয়। আমার ভাই ও তার স্ত্রীকেও মারধর করে হাত ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আমরা চৌদ্দগ্রাম থানায় প্রত্যেক ঘটনায় মামলা দায়ের করেছি।’
এ বিষয়ে প্রধান অভিযুক্ত আমিনুল হক তুহিন জানান, ‘মৃত আব্দুল খালেকের ছেলেরা জোরপূর্বকভাবে আমাদের জায়গা দখল করে রেখেছে। আমি সামাজিকভাবে চেষ্টা করেও তা সমাধান করতে পারিনি। তাই আমার পৈতৃক সম্পত্তি এলাকাবাসীকে নিয়ে দখলদারদের কাছ থেকে উদ্ধার করেছি।’
চৌদ্দগ্রাম মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মুহাম্মদ আরিফ হোসাইন বলেন, ‘বাতিসার হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় ভুক্তভোগীর পরিবার থানায় মামলা দায়ের করেছে। তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
