পারফেকশনিস্টের পারফেক্ট যাত্রা

আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২৬, ০৭:৪৯ এএম

নিখুঁত হতে চাওয়া দোষের নয়, কিন্তু সবকিছুতেই শতভাগ নিখুঁত হওয়ার অদম্য চেষ্টা কখনও কখনও মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও আত্মঅসন্তুষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই প্রবণতাকেই বলা হয় পারফেকশনিজম। পারফেকশনিস্ট মানুষ নিজের কাজের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ মান বজায় রাখতে চান, তবে সামান্য ভুলও সহজে মেনে নিতে পারেন না। ফলে সাফল্যের আনন্দের চেয়ে ব্যর্থতার ভয়ই বড় হয়ে ওঠে। তাই পারফেকশনিজমের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুটো দিকই বোঝা জরুরি। লিখেছেন সৈয়দ আখতারুজ্জামান

পারফেকশনিস্ট হওয়া নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত আছে। জাপানের হাজার বছরের পুরনো দর্শন ওয়াবি-সাবি (ডধনর-ঝধনর) পারফেপশনিস্ট হওয়াকে সমর্থন করে না। ‘ওয়াবি’ মানে ‘সাদাসিধে জীবনের সৌন্দর্য’ আর ‘সাবি’ মানে ‘সময়ের ছাপের সৌন্দর্য’। এই দর্শন সাধারণ জীবনের সারল্য, একটা কুঁকড়ে যাওয়া ধূসর ঝরা পাতা কিংবা একটি জীর্ণ কুটির দেখেও বলবে আহা কী সুন্দর! এই দর্শনে খুঁতই নিখুঁত। কিন্তু এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে মহাকাশযান বানাতে বসলে হয়তো নভোচারীরা আর চাঁদে নামতে পারতেন না। তাই পারফেকশনিস্ট বিষয়টা আপেক্ষিক এবং একই সঙ্গে পরিস্থিতিসাপেক্ষ। পারফেকশনিস্ট হতে চাওয়ার আগে বিষয়টা সম্পর্কে একটু ধারণা নেওয়া দরকার।

পারফেকশনিস্ট কে

একটা কাজকে নিখুঁত করার জন্য নিরন্তর এর পেছনে যে লেগে থাকে তাকেই পারফেকশনিস্ট বলে। তার মানে এই নয় যে, সে মানুষটি সব ক্ষেত্রে একই রকম আচরণ করবে, বা কাজটা পারফেক্টভাবেই শেষ করবে। অনেক পারফেকশনিস্ট বিজ্ঞানীকে আছেন যারা দৈনন্দিন জীবনে একদমই পারফেক্ট না এলেমেলো, বেহিসেবি, ভুলোমনা আর খুবই হেঁয়ালি কিন্তু আবিষ্কারের বেলায় পারফেকশনে বিন্দুমাত্র ছাড় নেই। আবার পারফেক্ট না হলেও চলে এমন অনেক ক্ষেত্রে কেউ কেউ সারাক্ষণ খুঁতখুঁত করেছেন। লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি তার জীবনের বহু পেইন্টিংকে বলেছেন এখনো কাজ বাকি আছে। অথচ সেগুলোকে পৃথিবীর সেরা শিল্পকর্ম বলে ধরা হয়। অভিনেতা আমির খানকে ‘মি. পারফেকশনিস্ট’ বলা হলেও ওনার ফ্লপ ছবির সংখ্যা নিতান্ত কম নয়। একজন পর্বতারোহীকে সামান্য একটু ভুলের জন্য প্রাণ হারাতে হতে পারে। তাই পারফেকশনিস্ট হতে চাওয়া একটি মানসিকতার নাম মাত্র, ক্ষেত্রবিশেষে যার চেহারা ও প্রয়োগ ভিন্ন ভিন্ন হয়। এর বৈচিত্র্যময় উপস্থিতি টুথব্রাশে পেস্ট লাগানো থেকে শুরু করে শিম্পাঞ্জির ডিএনএ-কোড আবিষ্কার পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে।

কর্মজীবনে পারফেকশন

প্রথমত, কর্মজীবনে পারফেকশন মাপার কোনো একক স্কেল নেই, যে স্কেলের মানদ-ে বলা যেতে পারে রাম দারুণ পারফেক্ট, শ্যাম মোটামুটি আর যদু একদমই পারফেক্ট নয়। দ্বিতীয়ত, আপনার কর্মজীবনের ধরন, ক্ষেত্র, বিষয় ও পদবির ওপর নির্ভর করে আপনার আদতেই পারফেকশিস্ট হওয়ার দরকার আছে কি না। তৃতীয়ত, আপনি মনেপ্রাণে পারফেকশনিস্ট হতে চান কি না। আর শেষ কথা হচ্ছে, সব কিছু বিবেচনা করে আপনি যদি পারফেকশনিস্ট হতেই চান, তাহলে পদ্ধতিগতভাবে এগোতে হবে এবং দীর্ঘ অধ্যবসায় ও ধৈর্য ধরে লেগে থাকার মানসিকতা থাকতে হবে।

কর্মজীবনে পারফেকশনিস্ট হওয়ার উপায়

এক. যে ক্ষেত্রটির ওপর আপনার বেশি দক্ষতা, আগ্রহ এবং প্রতিভা আছে বলে মনে হয় কেবলমাত্র সেই ক্ষেত্রেই পারফেক্টশনিস্ট হওয়ার সিদ্ধান্ত নিন। সব ক্ষেত্রে পারফেক্ট হতে যাওয়া বা চাওয়া কোনোটাই ঠিক হবে না।

দুই. পারফেকশনিস্ট কোনো জন্মগত স্বভাব নয়। ‘মাস্টারি’ বইয়ের বিখ্যাত লেখক রবার্ট গ্রিন লিখেছেন, দীর্ঘদিনের অধ্যবসায়, সঠিক শিক্ষা, অনুশীলন আর নিজের দক্ষতাকে ক্রমাগত (এক মাস বা এক বছর নয়, অবিরাম) শানিত করার মাধ্যমেই পারফেকশনিস্ট মানসিকতা অর্জন করতে পারেন।

তিন. আপনার বেছে নেওয়া ক্ষেত্রটিতে যারা ইতিমধ্যেই সফল তাদের কাছ থেকে শেখার চেষ্টা করুন। তাদের জীবনী পড়ুন। তাদের কাজ সম্পর্কে জানুন এবং অনুসরণ করুন।

চার. আগে বেসিক বিষয়গুলো খুব ভালো করে শিখতে হবে, তারপর আরও ভালো করার জন্য দীর্ঘ মেয়াদে সঠিক অনুশীলন করতে হবে। আপনার কাজটি যতক্ষণ পর্যন্ত নিখুঁত না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত লেগে থাকার নামই হচ্ছে পারফেকশনিস্ট মানসিকতা।

পাঁচ. আপনার একজন প্রশিক্ষক, গুরু বা মেন্টর দরকার। কর্মজীবনে উন্নতি, সফলতা বা পারফেকশন আসে ভুল সংশোধনের ধারাবাহিক প্রক্রিয়া থেকে। কিন্তু ভুল ধরিয়ে দেবে কে? সব ভুল তো নিজের চোখে ধরা পড়ে না! আর শুধু ভুল ধরা পড়লেই তো হবে না, সংশোধনের সঠিক উপায়ওতো জানতে হবে।

ছয়. চেকলিস্ট মেথড অনুসরণ করুন। যা যা করতে হবে, যখন এবং যেভাবে করতে হবে সব লিস্ট করে কাজ করুন। অতুল গাওয়ান্ডে তার ‘দ্য চেকলিস্ট মেনিফেস্টো’ বইয়ে লিখেছেন, একটি সহজ চেকলিস্ট অসংখ্য ভুল প্রতিরোধ করতে পারে। সার্জারি, বিমান চালনা, নির্মাণশিল্প বা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মতো অনেক কাজ বর্তমান যুগে চেকলিস্ট ছাড়া চলছে না। কারণ কাজগুলো নিখুঁত হতে হবে।

সাত. আপনার কর্মক্ষেত্রের চতুর্দিকে নজর রাখুন। কীভাবে নির্ভুল এবং প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করা যায় এই ‘প্রশ্ন’টা সহজ, কিন্তু এর উত্তর খুঁজে পাওয়া ততটা সহজ নয়। কর্মক্ষেত্রের জটিলতার মধ্যে ‘উত্তর’ অনেক সময়েই আড়ালে লুকিয়ে থাকে, চোখের সামনে থাকে না।

যা জানা জরুরি

সব পারফেকশনিস্টই সফল বা সুখী হন না।

ভুলকে শেখার অংশ হিসেবে গ্রহণ করা মানসিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

অতিরিক্ত আত্মসমালোচনা আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দিতে পারে।

কাজ নিখুঁত করার চেয়ে সময়মতো শেষ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

দীর্ঘদিন তীব্র পারফেকশনিজম থাকলে উদ্বেগ, স্ট্রেস বা বার্নআউটের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত