বর্ষার জলে ভরা চলনবিল এখন সবুজের সৌন্দর্যে নয়, কচুরিপানার ভয়াল আগ্রাসনে ঢাকা। দিগন্তজোড়া জলাভূমি ও আবাদি জমিতে কচুরিপানার ঘন আস্তরণ সৃষ্টি হওয়ায় থমকে যাচ্ছে কৃষিকাজ, অচল হয়ে পড়ছে নৌপথ। নাটোরের গুরুদাসপুর ও সিংড়া উপজেলার বিস্তীর্ণ বিলাঞ্চলের কয়েক হাজার হেক্টর জমি ইতোমধ্যে কচুরিপানার দখলে চলে গেছে। ফলে আমন ধান, আগাম সরিষা, গম ও ইরি-বোরোসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তায় পড়েছেন কৃষকেরা।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের ধারণা, এ সংকটে প্রায় ৩০ হাজার কৃষক সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। একই সঙ্গে নৌপথে চলাচল ব্যাহত হওয়ায় দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন বিলপারের বাসিন্দা, মাঝি, দিনমজুর ও চলনবিলে ঘুরতে আসা পর্যটকেরা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গত কয়েক বছরের বন্যার ক্ষত এখনো পুরোপুরি শুকায়নি। এর মধ্যেই কচুরিপানার নতুন আগ্রাসন কৃষকদের সামনে আরেকটি কঠিন সংকট হয়ে দেখা দিয়েছে। গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজীপুর ইউনিয়নের বিলশা, শ্রীপুর, বামনবারিয়া ও পিপলা, বিয়াঘাট ইউনিয়নের বিলহরিবাড়ি, যোগেন্দ্রনগর ও মশিন্দার একাংশ এবং সিংড়া উপজেলার ডাহিয়া, ইতালী, চৌগ্রাম, কলম, তাজপুর ও শেরকোল ইউনিয়নসহ অন্তত ৩০টি গ্রামের বিস্তীর্ণ বিলাঞ্চল কচুরিপানায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে।
বর্ষা মৌসুমে আমন ধানের আবাদই এখন সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে। জমিতে পানি থাকলেও কচুরিপানার ঘন স্তর সরানো না গেলে চারা রোপণ সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কৃষকেরা একদিকে সময় হারাচ্ছেন, অন্যদিকে বাড়তি খরচের বোঝা বহন করছেন।
কৃষকদের ভাষ্য, এক বিঘা জমি থেকে কচুরিপানা অপসারণ করতে ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। প্রতিজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা হওয়ায় প্রতি বিঘা জমি পরিষ্কার করতে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা। অনেক কৃষক ঋণ করে জমি পরিষ্কারের চেষ্টা করলেও শ্রমিক সংকটের কারণে কাজ এগোচ্ছে ধীরগতিতে।
বিলশা গ্রামের কৃষক ফারুক হোসেন বলেন, শুধু কচুরিপানা পরিষ্কার করতেই হাজার হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। কয়েক বছর ধরে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কার্যকর সরকারি কোনো সহায়তা পাইনি। এখন টাকা দিয়েও প্রয়োজনীয় শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না।
কচুরিপানার জট শুধু কৃষিজমিই গ্রাস করেনি, বিলাঞ্চলের বহু নৌপথও কার্যত অচল করে দিয়েছে। দুর্গম এলাকার মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত ব্যাহত হচ্ছে। নৌকা চলাচল কমে যাওয়ায় মাঝি ও দিনমজুরদের অনেকেই কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।
সাতপুকুরিয়া গ্রামের শিক্ষক টগর হোসেন বলেন, আগে নৌকায় সহজেই এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে যাওয়া যেত। এখন কচুরিপানার স্তর এত ঘন যে অনেক জায়গায় নৌকা চালানোই সম্ভব হচ্ছে না।
চলনবিল জীববৈচিত্র্য রক্ষা কমিটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ সাইফুল ইসলাম বলেন, চলনবিল দেশের অন্যতম প্রধান ধান উৎপাদন এলাকা। এখানে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হলে তার প্রভাব জাতীয় খাদ্য উৎপাদনেও পড়বে। একই সঙ্গে কচুরিপানার অতিরিক্ত বিস্তারে পরিবেশ ও জলজ জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে। স্থির ও দূষিত পানিতে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
খুবজীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মনিরুল ইসলাম দোলন বলেন, সিংড়া থেকে বারুহাস, গুরুদাসপুর, তাড়াশ হয়ে চাটমোহর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ বিলাঞ্চল কচুরিপানায় ঢেকে গেছে। গত বছরের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা এবার নতুন বিপদের মুখে পড়েছেন। দ্রুত সরকারি উদ্যোগে কচুরিপানা অপসারণ করা না হলে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।
গুরুদাসপুর উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা কে. এম. রাফিউল ইসলাম বলেন, এবার বিলে পানিপ্রবাহ কম থাকায় কচুরিপানার বিস্তার ঘটেছে। কোথাও কোথাও বাঁধ ও সুতি দিয়ে পানির স্বাভাবিক প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। কৃষকদের দ্রুত কচুরিপানা সরানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে।
গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহমিদা আফরোজ বলেন, বিষয়টি জানার পর কৃষি বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের পর প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে।
স্থানীয়দের দাবি, চলনবিলের এই সংকটকে বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জরুরি ভিত্তিতে সমন্বিত উদ্যোগে কচুরিপানা অপসারণ, বিলের পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। তা না হলে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই কৃষি অঞ্চল একদিকে যেমন উৎপাদন সংকটে পড়বে, অন্যদিকে হারাবে তার চিরচেনা জলজ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য।
গাড়িতে নয়, বাবার পুরনো সাইকেলে চড়ে বিয়ের আসরে গেলেন কনে