এসি মিলান ও ইতালি জাতীয় দলের অবিসংবাদিত প্রতীক, 'ডিফেন্স মিনিস্টার' নামে খ্যাত কিংবদন্তি ডিফেন্ডার ফ্রাঙ্কো বারেসি ৬৬ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। গত বছর ফুসফুসের টিউমার অস্ত্রোপচারের পর দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারের সাথে লড়াই করছিলেন তিনি।
ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ডিফেন্সিভ প্লেমেকার ও অধিনায়কের বিদায়ে পুরো বিশ্ব ফুটবলে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
বারেসির প্রয়াণে গভীর শোক প্রকাশ করে এসি মিলান তাদের আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে বলেছে, "এসি মিলানের ইতিহাস আজ গভীর শোকে নিমজ্জিত। ফ্রাঙ্কো বারেসির রেখে যাওয়া উদাহরণ এবং তাঁর অবদান সবসময় ক্লাবটির ডিএনএ এবং পথচলার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে থাকবে—ঠিক যেমন অমর হয়ে আছে তাঁর ৬ নম্বর জার্সিটি।"
২০২৬ সালের মিলান-কোর্টিনা শীতকালীন অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও তিনি অলিম্পিক মশাল বহনকারীদের একজন ছিলেন। ফুটবল বিশ্বের প্রতিপক্ষ দলের তারকা থেকে শুরু করে কোটি ভক্ত তাকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছেন।
জীবনের পথচলা ও রোসোনেরি অধ্যায়
১৯৬০ সালের ৮ মে জন্ম নেওয়া বারেসি মাত্র ১৪ বছর বয়সে মা-বাবাকে হারান। কিশোর বয়সেই এসি মিলানের ট্রায়ালে সুযোগ পান তিনি। একই সময়ে তাঁর বড় ভাই জুসেপ্পে বারেসি (বেপ্পে) যোগ দেন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইন্টার মিলানে। এরপর মিলান ডার্বিতে মাঠে দুই ভাই মুখোমুখি লড়াই করলেও ম্যাচ শেষে শৈশবের মতোই একে অপরকে জড়িয়ে ধরতেন।
১৯৭৮ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে এসি মিলানের হয়ে সিরি 'আ'-তে অভিষেক হয় তাঁর। নেতৃত্বগুণ, নিখুঁত টেকনিক এবং রক্ষণভাগের নিয়ন্ত্রক হিসেবে অসাধারণ দক্ষতার কারণে মাত্র ২২ বছর বয়সেই তাকে এসি মিলানের অধিনায়ক করা হয়। সমর্থকদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন "পিসিনিন" (ছোট খোকা) নামে।
মাঠে এক নীরব ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতৃত্ব
ড্রেসিংরুম ও ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত শান্ত ও পরিমিতভাষী হলেও মাঠের ভেতরে বারেসি ছিলেন ক্ষমতার প্রতীক ও সত্যিকারের নেতা:
অফসাইড ট্র্যাপের মাস্টার: কোচ আরিগো সাচ্চির কৌশলগত রক্ষণভাগের শেষ প্রহরী হিসেবে বারেসি একাই পুরো রক্ষণ সামলাতেন। রেফারির কোনো ভুল হলে শুধু হাত তুলে সংকেত দিয়েই তিনি সতীর্থদের দিকনির্দেশনা দিতেন।
ঐতিহাসিক জুটি: বিলি কোস্তাকুর্তার সাথে কেন্দ্ররক্ষণে তাঁর মেলবন্ধন এবং পাওলো মালদিনি, রুদ খুলিত, ফ্রাঙ্ক রাইকার্ড, মার্কো ভ্যান বাস্তেন ও কার্লো আনচেলত্তির মতো তারকাদের পেছনে থেকে পরিচালনা করে এসি মিলানকে তিনি পৌঁছে দিয়েছিলেন বিশ্ব ফুটবলের চূড়ায়।
৯৪ বিশ্বকাপে বীরত্ব ও অশ্রুসিক্ত ট্র্যাজেডি
বারেসির বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারে অসংখ্য ট্রফি থাকলেও ১৯৯৪ সালের প্যাসাডেনার সেই ফাইনালটি তাঁর স্মৃতিতে সবচেয়ে গভীরভাবে গেঁথে ছিল। হাঁটুতে ইনজুরির পর মাত্র ২৫ দিনের মাথায় অস্ত্রোপচার কাটিয়ে ৩৪ বছর বয়সে ফাইনালে ব্রাজিলের রোদ্রিগো আলদাইর ও রোমারিওদের আক্রমণভাগকে ১২০ মিনিট ধরে একা হাতে স্তব্ধ করে দেন বারেসি।
১২০ মিনিটের লড়াই শেষে টাইব্রেকারে দলের প্রথম শটটি নিতে গিয়ে তিনি বল ক্রসবারের ওপর দিয়ে মারেন। পরবর্তীতে মাসারো ও রবার্তো বাজ্জিওর ভুলের পর ব্রাজিল বিশ্বকাপ জিতে নিলে কোচ আররিগো সাকির বুকে মাথা রেখে বারেসির কান্না ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম করুণ ও স্মরণীয় দৃশ্য হয়ে থাকে।
প্রাপ্তি ও অর্জনে মোড়ানো ক্যারিয়ার
এসি মিলানের হয়ে ৭১৯টি ম্যাচ খেলা বারেসি ক্লাবের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল অধ্যায়গুলোর নেতৃত্ব দিয়েছেন:
এসি মিলানের হয়ে: ৬টি সিরি 'আ' শিরোপা, ৩টি ইউরোপিয়ান কাপ/চ্যাম্পিয়নস লিগ এবং ২টি ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ।
জাতীয় দলের হয়ে: মোট ৮১টি ম্যাচ খেলেছেন। ১৯৮২ সালে বিশ্বকাপ জয়ী ইতালি দলের সদস্য ছিলেন এবং ১৯৯৪ সালে ইতালিকে অধিনায়ক হিসেবে ফাইনালে তোলেন।
১৯৯৭ সালে ফুটবল থেকে অবসর নেওয়ার পর তাঁর অবদানের স্মরণে এসি মিলান তাদের ৬ নম্বর জার্সিটিকে চিরতরে অবসর দেয়। ফুসফুসের ক্যানসার ৬৬ বছর বয়সে তাঁর জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দিলেও, প্যাসাডেনার সেই চোখের জল আর মাঠের 'প্রতিরক্ষা মন্ত্রী'র সাহসী নেতৃত্ব ফুটবল বিশ্ব কোনোদিন ভুলবে না।
