বিলুপ্তির পথে রানী মাছ, হুমকিতে দেশীয় জীববৈচিত্র্য

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২৬, ০৪:১৯ এএম
বর্ষার পানিতে টইটম্বুর হাওর, নদী আর খাল-বিল একসময় ছিল দেশীয় প্রজাতির রানী মাছের নিরাপদ আবাস। মৌসুম এলেই জেলেদের জালে ধরা পড়ত রূপালি আভায় ঝলমলে এই মাছ, আর গ্রামীণ হাট-বাজার ভরে উঠত এর কদরে। স্বাদ, পুষ্টিগুণ ও সহজলভ্যতার কারণে রানী মাছ ছিল বাংলার জলজ ঐতিহ্যের এক পরিচিত নাম। কিন্তু প্রকৃতির সেই চিরচেনা দৃশ্য আজ দ্রুতই হারিয়ে যাচ্ছে।
 
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, প্রাকৃতিক জলাশয়ের সংকোচন, নদী-খালের নাব্যতা হ্রাস, অপরিকল্পিত উন্নয়ন, দূষণ এবং নির্বিচারে মাছ আহরণের ফলে দিন দিন কমে যাচ্ছে রানী মাছের সংখ্যা। একসময়ের সহজলভ্য এই দেশীয় প্রজাতি এখন অনেক এলাকায় দুর্লভ, কোথাও কোথাও প্রায় বিলুপ্তির মুখে।
 
মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার প্রবীণ জেলেরা জানান, কয়েক বছর আগেও নদী কিংবা হাওরে জাল ফেললেই সহজে রানী মাছ ধরা পড়ত। এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা জাল ফেলেও অনেক সময় একটি মাছেরও দেখা মেলে না। স্থানীয় বাজারে এ মাছ এখন খুব কম আসে। মাঝে মধ্যে অল্প পরিমাণে পাওয়া গেলেও উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থেকে যায়।
জেলেদের মতে, প্রজনন মৌসুমে নির্বিচারে পোনা ও ছোট মাছ নিধন, অবৈধ কারেন্ট জালের ব্যবহার এবং জলাশয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ধ্বংস হওয়ায় রানী মাছের বংশবিস্তার মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
 
অন্যদিকে কৃষিজমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার এবং জলাশয় ভরাটের ফলে মাছের প্রাকৃতিক আবাসও ক্রমেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে।
 
মৎস্যজীবী মিলন রাজু বলেন, দেশীয় মাছ শুধু মানুষের খাদ্য নয়, জলজ বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রানী মাছ হারিয়ে গেলে একটি প্রজাতি নয়, পুরো জলজ পরিবেশের ভারসাম্যই হুমকির মুখে পড়বে। এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই মাছকে শুধু বইয়ের পাতায় বা ছবিতেই চিনবে।
 
শিক্ষক ও লেখক সৌরভ চন্দ্র দেব বলেন, দেশীয় মাছ রক্ষায় প্রজনন মৌসুমে মাছ আহরণে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ জাল বন্ধ, নদী-খাল পুনঃখনন, প্রাকৃতিক জলাশয় সংরক্ষণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। একই সঙ্গে দেশীয় প্রজাতির মাছ সংরক্ষণে গবেষণা ও সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
 
বড়লেখা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মিসবাহ উদ্দিন আফজাল বলেন, রানী মাছ বিলুপ্তির অন্যতম কারণ হলো নদী-নালা ও খাল-বিল সেচে ফেলে মাছ ধরা এবং নির্বিচারে পোনা নিধন। ক্ষতিকর জালের ব্যবহার বন্ধ এবং প্রাকৃতিক জলাশয়ে নিরাপদ অভয়াশ্রম গড়ে তুলতে পারলে এ প্রজাতির সংখ্যা আবারও বাড়ানো সম্ভব। দেশীয় মাছ সংরক্ষণে সরকার বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। তবে এসব উদ্যোগ সফল করতে জেলে, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ জরুরি।
 
বিশেষজ্ঞদের মতে, রানী মাছ রক্ষা করা মানে শুধু একটি দেশীয় প্রজাতিকে টিকিয়ে রাখা নয়; বরং বাংলাদেশের জলজ জীববৈচিত্র্য, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং খাদ্যনিরাপত্তাকে ভবিষ্যতের জন্য সুরক্ষিত করা। তাই সময় থাকতে কার্যকর ও বিজ্ঞানভিত্তিক সংরক্ষণ উদ্যোগ গ্রহণই হতে পারে এই হারিয়ে যেতে বসা জলজ সম্পদকে ফিরিয়ে আনার একমাত্র পথ।
×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত