মেরিলিন মনরো। স্বর্ণকেশী লাস্যময়ী এই কিংবদন্তির হাসির ঝলকানিতে, অপার সৌন্দর্যের মুগ্ধতায়, সুমিষ্ট কণ্ঠের আবেশে, তীক্ষ্ণ চাহনিতে মোহাবিষ্ট করে করে রেখেছেন গোটা দুনিয়ার লাখ লাখ তরুণকে। তাই তো মৃত্যুর এত বছর পরেও সর্বকালের সেরা আবেদনময়ী তারকা ও অভিনেত্রী হিসেবে শীর্ষে স্মরণ করা হয় হলিউডের সৌন্দর্যের এ রানীকে। মোহনীয় হাসি, ঝলমলে চুলের আভা আর হাসির জাদুতে মনরোর রূপালির জগতের মাধ্যমে দর্শক-হৃদয়ে যে জায়গা করে গেছেন, তা আজও অমলিন। ‘গ্রেটেস্ট ফিমেল স্টার অফ অল টাইম’ খেতাব পাওয়া এই নক্ষত্রের আজ মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৬২ সালের এই দিনে (৫ আগস্ট) মাত্র ৩৬ বছর বয়সেই পাড়ি জমান না ফেরার দেশে। লস অ্যাঞ্জেলসে নিজ বাসভবনেই তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
তার মৃত্যু আজও অমিমাংসিত রহস্য হয়ে আছে গ্ল্যামার দুনিয়ায়। চিকিৎসকের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, জন্মগত সৌন্দর্যকে আরও নিখুঁত করতে মনরো কসমেটিক সার্জারিও করিয়েছিলেন চিবুকে। একাকীত্ব আর হতাশায় বেশিরভাগ সময়েই তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকতেন। এছাড়া নেশাদ্রব্যের ছাপ তার চেহারায় বিষন্নতা ফুটিয়ে তুলেছিল। রিপোর্টে মৃত্যুর কারণ হিসেবে ড্রাগ ওভারডোজকে দায়ী করা হলেও অনেকে আজও বিশ্বাস করে মনরোকে হত্যা করা হয়েছিল পরিকল্পিতভাবে। ছোটবেলার দুর্ভাগ্য কাটিয়ে একসময় ভালবাসা, নাম, যশ, খ্যাতি সবই অর্জন করেছিলেন। কিন্তু শেষজীবনে বারবার কঠিন পরিস্থিতি যেন নিঃসঙ্গই করে দিয়েছিল তাকে। তবে মাত্র ৩৬ বছর বয়সে জীবন প্রদীপ নিভে গেলেও তার হাসির মোহাবিষ্ট লাখ লাখ ভক্ত আজও তার সৌন্দর্যের রহস্য খুঁজে বেড়ায়।
পিতৃপরিচয়হীন অবস্থায় মানসিক ভারসাম্যহীন মায়ের গর্ভে জন্ম নেয় মেরিলিন মনরো। একদিকে দারিদ্র্য, অন্যদিকে অভিভাবকহীনতায় আশ্রয় জোটে এতিমখানায়। পরবর্তীতে জীবনের নানা উত্থান-পতন কাটিয়ে সময় যেন তাকে নতুনভাবে গড়ে তোলে। ছোটবেলার এই অসহয়ত্বই যেন সাফল্যে তার মনোবল হয়ে দাঁড়ায়। ভাগ্যের সুপ্রসন্নতায় মডেল হিসেবে শুরু হয় তার ক্যারিয়ার। নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন মার্কিন অভিনেত্রী, মডেল এবং গায়িকা হিসাবে। দুর্ভাগ্য নিয়ে জন্মালেও সৃষ্টিকর্তা যেন দু’হাত ভরে সৌন্দর্য দিয়েছিল তাকে।
রূপালি জগতে প্রবেশের পূর্বে ক্ষণজন্মা এই অভিনেত্রীর নাম ছিল নর্মা জীন বেকার। ১৯২৬ সালের ১ জুন ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে কাউন্টি নামক একটি হাসপাতালে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। মা গ্লাডিস পার্ল বেকারের তৃতীয় সন্তান মনরো। গ্লাডিস ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে ফিল্ম নেগেটিভ কাটার কাজ করতেন। মাত্র পনের বছর বয়সে বিয়ে করেন তার চেয়ে নয় বছর বড় জন নিউটন বেকারকে। দাম্পত্য জীবনে তাদের রবার্ট এবং বার্নিস নামে দুই সন্তানের জন্ম হয়। তবে ১৯ বছর বয়সেই জনের সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায় এবং জন দুই সন্তান নিয়ে কেন্টাকি চলে যান।
এর প্রায় তিন বছর পর ১৯২৪ সালে গ্লাডিস পুনরায় বিয়ে করেন মার্টিন এডওয়ার্ড মর্টেনসনকে। মনরো যখন তার গর্ভে, তখন মার্টিন জানতে পারেন এই সন্তান তার নয়। এমনকি মানসিকভাবে অসুস্থ গ্লাডিস নিজেও এ ব্যাপারে নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হন। মনরোর জন্মের ২ বছর পর ১৯২৮ সালে মার্টিন গ্লাডিসকে তালাক দিয়ে চলে যান। ফলে মনরোকে নিয়ে অসহায় হয়ে পড়েন গ্লাডিস। তার স্বল্প আয়ে মনরোর ভার নেওয়া তার পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ে। এমনকি তিনি বেশ কয়েকবার মনরোকে বালিশ মুখে চেপে মেরে ফেলারও চেষ্টা করেন। তাই তখন তাকে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, আর ছোট্ট মনরোকে রেখে আসা হয় এতিমখানায়।
মনরোর শৈশব কেটেছে অনেক কষ্টে। অনাথ আশ্রমের কঠোর অনুশাসনের মাঝে তার জীবন আরো দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। এরপর ১২ বছর বয়সে এক পালক পিতা-মাতার গৃহে আশ্রয় পান মনরো, ফলে চাইল্ড হোমের অনুশাসন থেকে মুক্তি মেলে তার। সেখানে তিনি পূর্ণ স্বাধীনতায় জীবনযাপন শুরু করেন। এই পালক মা ছিলেন তার আসল মায়েরই বান্ধবী। কিন্তু ভাগ্য সেখানেও তার সহায় ছিল না। ১৯৪২ সালে পরিবারে অভাব দেখা দেয়। ফলে তাদের অভাব-অনটনের মাঝে মনরোর দেখাশোনা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। তাই পুনরায় তারা মনরোকে আশ্রমে পাঠানোর মনঃস্থির করেন। কিন্তু সেখানেও অমানুষিক আত্যাচারের শিকার হন তিনি।
মনরো যে বাড়িতে থাকতেন তার পাশেই থাকতেন জেমস ডগার্থি । প্রতিবেশী হওয়ার সুবাদে মনরোর সাথে আলাপ এবং পরবর্তীতে গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পুনরায় আশ্রমে যাওয়ার ভয়ে সে বছরেই জেমসের সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে করেন মনরো। জেমস এয়ার ক্রাফট প্লান্টে কর্মরত ছিলেন। জেমসের সহায়তায় বিয়ের পর মনরো এরোপ্লেন পার্টস কোম্পানীতে শ্রমিক হিসেবে কাজ পান। রূপের লাবণ্য আর শরীরের মোহনীয় অভিব্যক্তির জন্য অল্প কিছুদিনের মাঝেই সেখানকার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আসেন মনরো। কোম্পানির শো-গার্ল হিসেবে মডেলিংয়ের সুযোগ পান তিনি।
কাজের মাধ্যমেই তার পরিচয় হয় ডেভিড কনোভার সঙ্গে। ডেভিড একটি পত্রিকার জন্য তাকে মডেলিংয়ের প্রস্তাব দেন এবং পরবর্তীতে সেই ছবি বিভিন্ন মহলে ব্যাপক সাড়া তোলে। মডেলিংয়ের নেশায় মনরো ভালো সম্পর্ক গড়ে তোলেন ডেভিডের সাথে।এরপরেই বেশ কয়েকটি পত্রিকায় তার ছবি ছাপা হয় এবং সৌন্দর্যের আলোড়নে বড় বড় এজেন্সি থেকে মডেলিংয়ের জন্য প্রস্তাব আসতে থাকে। গ্লামার জগতে তার ঝোঁক থাকলেও সেখানে বাধা হয়ে আসেন স্বামী জেমস। ‘সংসার করতে হলে মডেলিং ছাড়তে হবে’- এমন পরিস্থিতিতে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে জেমসের সাথে চার বছরের সংসার জীবনের ইতি টানেন তিনি।
১৮৪৬ সালে প্রথম অভিনয় জগতে পা রাখেন মনরো। সেখান থেকেই নর্মা জীন বেকার নাম পরিবর্তন করে পরিচিত হন মেরিলিন মনরো নামে। বাদামী চুলের রঙ পরিবর্তন করে তাতে প্লাটিনামের সোনালী আভা আনেন, পরবর্তীতে এই স্বর্ণালী কেশই তাকে অন্যদের থেকে দৃষ্টিনন্দন করে তোলে দর্শকদের কাছে। ১৯৪৭ সালে টুয়েন্টিথ সেঞ্চুরি ফক্স স্টুডিও পরিচালিত দুটি ছবি প্রকাশ, পায় যাতে খুব অল্প সময়ের জন্য পর্দায় দেখা যায় মনরোকে। কিন্তু এতে তিনি তেমন জায়গা করতে সক্ষম হননি দর্শক-হৃদয়ে। এরপর ১৯৫০ সালে এই স্টুডিও পুনরায় ‘অল অ্যাবাউট ইভ’ চলচিত্রের জন্য তাকে চুক্তিবদ্ধ করে। এই সিনেমায় লাস্যময়ী অভিনয়ে রাতারাতিই তারকা বনে যান তিনি। এর পরের গল্পটা কেবলই সাফল্যের।
পর্দায় তার খোলামেলা পোশাক একদিকে যেমন সমালোচনার ঝড় তুলেছে, অন্যদিকে তিনি হয়ে ওঠেন লাখো তরুণের হৃদয়ের রানী। ১৯৫৪ সালের ১৪ জানুয়ারি দ্বিতীয়বার বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন দীর্ঘদিনের বন্ধু ডি মিয়াগোর সঙ্গে। বিয়ের পর তিনি কোরিয়া যান এবং সেখানে বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন তাকে গায়িকা হিসেবেও জনপ্রিয় করে তোলে। সেই বছরেই ফেব্রুয়ারি মাসে ‘ফটোপ্লে অ্যাওয়ার্ড’ থেকে সেরা অভিনেত্রীর পুরষ্কার পান তিনি। এরপর ম্যানহাটনের একটি সাবওয়েতে ‘দ্য সেভেন ইয়ার ইচ’ সিনেমার শুটিংয়ে বাতাসে ওড়া স্কার্টের একটি দৃশ্য রেকর্ড করা হয়। সেখানে প্রায় দুই শতাধিক দর্শক মনরোর সেই দৃশ্য বেশ উপভোগ করছিল। সাদা পোশাকের সেই ছবিটিও পরবর্তীতে বেশ আলোড়ন তোলে। তবে তার এই দৃশ্যে অভিনয়ে বেশ বিরক্ত হন ডি মিয়াগো। ফলে মাত্র ৯ মাস পরেই তিনি ডিভোর্স দেন মনরোকে।
এরপর বেশ কিছুদিন নিজেকে অভিনয় জগত থেকে সরিয়ে অভিনয় শেখা ও বিভিন্ন কর্মশালায় ব্যস্ত রাখেন মনরো। সেসময় একাকী জীবনে সঙ্গী হয়ে আসেন চিত্রনাট্যকার আর্থার মিলার। ১৯৫৬ সালের ২৯ জুন মনরো তৃতীয়বারের মতো বিয়ে করেন। স্বামী আর্থার মিলারের সাথেই তিনি সবচেয়ে সুখে ছিলেন। বিয়ের পর নতুন রুপে আবার আসেন পর্দায় ‘বাস স্টপ’, ‘দ্য প্রিন্স এন্ড দ্য শোগার্ল’ সিনেমার মাধ্যমে। ‘দ্য প্রিন্স এন্ড দ্য শোগার্ল’ সিনেমাটি ইউরোপে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং বাফটা অ্যাওয়ার্ডের মনোনয়ন পায়। এছাড়াও সে বছরে ইতালি ও ফ্রান্সে দুটি পুরষ্কার অর্জন করেন তিনি।
ক্যারিয়ারের এই মধ্যগগনে জীবনের নানা হতাশায় তিনি অধিক ঔষধ সেবন ও মদ্যপান শুরু করেন। ফলে কাজে অনিয়ম আর অমনযোগী মনরো পরিচালকদের কাছেও অপ্রিয় হতে শুরু করেন। শোনা যায়, এরই মাঝে সন্তানসম্ভবা হলেও জটিলতার কারণে তিনি মা হতে পারেননি। ১৯৫৯ সালে তার জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে ‘সাম লাইক ইট হট’ সিনেমার মাধ্যমে। এই সিনেমায় তিনি একজন গায়িকার ভূমিকায় নজরকাড়া অভিনয় করেন এবং বিপুল সমাদৃত হন। তার অসাধারণ অভিনয়ের জন্য জিতে নেন গোল্ডেন গ্লোব পুরস্কার। মনরোর অভিনীত শেষ চলচিত্র ছিল দ্য মিসফিট (১৯৬১)। ১৯৬১ সালেই ব্যক্তিগত মতামতের অমিল হেতু ডিভোর্স হয় মিলার ও মনরোর।
জীবনের নানা সময়ে নানা মানুষের সাহচর্যে বেষ্টিত থাকলেও শেষ জীবনে পাশে কেউই ছিলো না মনরোর। লস অ্যাঞ্জেলসে একাই থাকতেন তিনি। পরবর্তীতে ১৯৬২ সালের স্নায়ুযুদ্ধের সময় দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েনের সময় প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডির একজন ঘনিষ্ট লোক হিসেবে কাজ করতেন তিনি। শেষ জীবনে কেনেডির সাথে বেশ ঘনিষ্টতার কাহিনী শোনা যায় তার। সেই বছর মে মাসে কেনেডির জন্মদিনে আমন্ত্রিত ছিলেন তিনি এবং পার্টিতে তার গাওয়া ‘হ্যাপি বার্থডে প্রেসিডেন্ট’ গানটি এখনও মানুষের কানে ভাসে। এছাড়াও তার গাওয়া ‘মাই হার্ট বিলংস টু ড্যাডি’, ‘আই ওয়াননা বি লাভড বাই ইউ’ এবং ‘ডায়মন্ডস আর এ গার্লস বেস্ট ফ্রেন্ডস’ গানগুলোও বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল, যা তাকে সফল গায়িকার খেতাব দিয়ে গেছে।
