নাটকের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন তারকারা

আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২৬, ১২:৪২ এএম

মানহীন গল্প, মাত্রাতিরিক্ত বিজ্ঞাপন, সিনিয়র ও জনপ্রিয় শিল্পী-কলাকুশলীদের সুযোগের অভাব সব মিলিয়ে চরম দুরবস্থায় দেশের বর্তমান নাটক। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে প্রযোজকের চাহিদা, বিজ্ঞাপনদাতাদের চাপ, সিডিউল স্বল্পতা, ন্যূনতম বাজেট। শুধু কি তাই! বিদেশি সিরিয়ালের আধিক্য, শিল্পে বিনিয়োগের অভাব এবং রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের খ্যাতিমান ও সিনিয়র অভিনয়শিল্পীরা। লিখেছেন জাহাঙ্গীর বিপ্লব

একটা সময় টিভি নাটকই ছিল ড্রয়িংরুম-নির্ভর বিনোদনের প্রাণকেন্দ্র। সেই টিভি নাটক এখন চলে গেছে ভয়ানক সিন্ডিকেটের দখলে। যার দরুন নাটক দেখা একদম ছেড়েই দিয়েছেন বেশিরভাগ দর্শক। তাদের মনে আস্থার জায়গা করে নিচ্ছে দেশি-বিদেশি বেশকিছু ওটিটি প্ল্যাটফর্ম। বিজ্ঞাপনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে টিভি নাটক থেকে চোখ সরিয়ে দর্শক নিজের পছন্দমতো বিনোদন কিনছেন পকেটের টাকা খরচ করে।  এ বিষয়ে বরেণ্য অভিনেতা আফজাল হোসেন বলেন, বর্তমানে কতজন আছেন এখনকার ইন্ডাস্ট্রিতে। হাতে গোনা দু-চারজন। আমি তো নেই-ই। ইন্ডাস্ট্রি কী তা প্রথমে জানতে হবে, বুঝতে হবে ভালো করে। যদি আমরা নিজের পায়ে কুড়াল মারার কাজ করি, তাহলে আর উপায় কী? সবার কথা শুনি। শেষে হয়তো কথা একটাই হবে আমরা ভালো নেই।’

আফজাল হোসেনের মতো অভিনেতা তারিক আনাম খানও প্রশ্নের ভঙিতে বলেন, ‘মূল্যবোধটা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে, বিষয়টা এক ধরনের পীড়া দেয়। রুচিশীল মধ্যবিত্ত সেই টেলিভিশন নিজস্ব দর্শক তৈরি করেছিল। প্রচুর দর্শক নাটক দেখতেন। ডিআইটিতে শুরুটা হয়েছিল। মুস্তাফা মনোয়ার শুরু করেছিলেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, ইন্ডাস্ট্রি কি কোনোদিন ছিল?’

অভিনেতা ও নির্মাতা সালাহউদ্দিন লাভলু বলেন,  এখন শুধু ভিউ আর ভিউ। আর কোনো চিন্তাভাবনা আছে বলে মনে হয় না। ব্যবসা আর ব্যবসা। যিনি মালিক তিনি বড় ব্যবসায়ী। টিভি চ্যানেলকে তারা হাতিয়ার হিসেবে নিয়েছেন। প্রতিভা নয়, বাণিজ্যটা বেশি বোঝেন তারা। শিল্প এখানে কম। আমি বারবার এই কথাগুলোই বলছি। কিন্তু প্রতিকার নেই।’

বিষয়টি নিয়ে অভিনয়শিল্পী সংঘের সভাপতি আজাদ আবুল কালাম বলেন, ‘উত্তরণের উপায় জানি না। এর জন্য দায়ী আমরাই। সমস্যাটা নিজেদের মধ্যে। আয়না দেখি। পরিষ্কার করি না। পরিষ্কার করা দরকার। আমরা সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারি না। সেটি দরকার। অভিনয়শিল্পীদের এখনো রাষ্ট্রীয়ভাবে পেশার স্বীকৃতি নেই। তিনি সহকর্মীদের একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়ে বলেন, শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, কর্মক্ষেত্র তৈরির মাধ্যমেও শিল্পীদের সহযোগিতা করা জরুরি।’ অভিনেতা শহীদুজ্জামান সেলিম বলেন, বাংলা ডাবিং করা বিদেশি সিরিয়ালের কারণে দেশীয় নাটকের বাজার সংকুচিত হচ্ছে। তার ভাষায়, কম খরচে বিদেশি সিরিয়াল কিনে প্রচার করায় টেলিভিশন চ্যানেলগুলো দেশীয় নির্মাণে আগ্রহ হারাচ্ছে। পিক আওয়ারে বিদেশি সিরিয়াল প্রচার সীমিত করার নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করলে দেশীয় শিল্পী ও নির্মাতাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হবে। সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অনেক শিল্পী ও নির্মাতা আর্থিক সংকটে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। শিল্প ও সংস্কৃতির বিকাশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানোরও দাবি জানান তিনি।

অভিনেতা তৌকীর আহমেদ বলেন, দেশের অধিকাংশ টেলিভিশন চ্যানেল এখন সংবাদ ও বাণিজ্যিক কনটেন্টকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। ফলে নাটক, সিনেমা ও সংস্কৃতিচর্চার পরিসর কমছে। এতে অভিনয়শিল্পীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। এ সংকট মোকাবিলায় নীতিনির্ধারকদের দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

কথা হয় সময়ের তরুণ এবং উঠতি তারকাদের সঙ্গেও। এখনকার ব্যস্ত টিভি অভিনেতা তৌসিফ মাহবুব বলেন, ‘আমরা মানুষ, মানুষ মাত্রই ভুল করে। আমার অভিনয়জীবন থেকে শুরু করে ব্যক্তিজীবনেও অনেক সময় অনেক ভুল করেছি। এই ভুলগুলো থেকে শিখেই আমি আজকের তৌসিফ মাহবুব, এতটুকু পর্যন্ত এসেছি; কিন্তু একই ভুল যদি আবার করি, সেটা মানুষকে সামনে এগোনো থেকে আটকে রাখে। আমার সামনের যাত্রাটা যেন আরও মসৃণ হয়, আমি যেভাবে চাই সেভাবেই যেন হয়।’

তবে একটু অন্যরকম চিন্তার কথা জানালেন এই সময়ের আরেক ব্যস্ত টিভি অভিনেত্রী জান্নাতুল সুমাইয়া হিমি। তার ভাষ্য, ‘এতদিন বুঝে না বুঝে অনেক কাজ করেছি। দর্শকের সঙ্গে অনেক বেশি কানেক্টেড ছিলাম; কিন্তু এর বিপরীতে নিজেকে, পরিবারকে বা আমার যেসব প্যাশন আছে, যেমন পেইন্টিং, বই পড়া এগুলোতে সময় দেওয়া হয়নি। এ বছর এ জায়গাগুলোতে সময় দিতে চাই। যে কাজ ভালো লাগবে, সেগুলো করব আর শখের কাজগুলো করব।’

আরেক চাহিদাসম্পন্ন অভিনেত্রী তাসনিয়া ফারিণও চাইছেন গুছিয়ে এবং পরিকল্পনামাফিক কাজ করতে। টিভি নাটকের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা ফারহান আহমেদ জোভান বলেন, ‘এমন সব কাজে যুক্ত হতে চাই, যেন মানুষের মনে নিজের জায়গাটা ধরে রাখতে পারি। আমার কিছু পরিকল্পনা আছে। বছরজুড়ে এমন কিছু কাজ করতে চাই, যেগুলো মানুষের মনে দাগ কাটবে। সেই পরিকল্পনায় এগোনোর চেষ্টা করব। আর নাটকের মানের দিকে সবারই ইতিবাচক পরিকল্পনা করতে হবে। সরকারকেও এগিয়ে আসতে হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত