ইনফান্তিনোকে সমর্থন দেয়নি বাংলাদেশ

আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২৬, ১২:৫০ এএম

বিশ্বকাপের বেসরকারীকরণ ও ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ প্রকল্প নিয়ে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে বাংলাদেশ আগাম কোনো সমর্থন দেয়নি বলে রবিবার জানিয়েছেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) সভাপতি তাবিথ আউয়াল। আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হওয়ায় সরকার ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করেই এ বিষয়ে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানানো হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক একটি সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়, ফিফা সভাপতির প্রস্তাবিত উদ্যোগকে বাংলাদেশ সমর্থন জানিয়েছে। তবে সেই খবর সরাসরি নাকচ করেছেন তাবিথ আউয়াল। তার ভাষ্য, বাফুফে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আগাম সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়নি। বাফুফে সভাপতি বলেন, ‘ফেডারেশনের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নির্বাহী কমিটির (ইসি) সভায় আলোচনা ও অনুমোদনের পর আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ প্রকল্প নিয়েও একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কথা ছিল। কিন্তু ইসি বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই ফিফা প্রকল্পটি বাতিল ঘোষণা করে।’ তাবিথ আউয়াল যোগ করেন, ‘আমরা কোনো অগ্রিম সাপোর্ট বা কনফার্মেশন দিইনি। কোনো ব্যক্তির জন্যও দিইনি, কোনো প্রতিষ্ঠানের পক্ষেও দিইনি।’

ইনফান্তিনোর প্রস্তাবিত এই প্রজেক্টের আওতায় ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর ফিফা বিশ্বকাপের ২০ শতাংশ বাণিজ্যিক স্বত্ব একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করার পরিকল্পনা করা হয়েছিল। বর্তমানে ‘ফিফা ফরোয়ার্ড’ কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি সদস্য অ্যাসোসিয়েশন সর্বোচ্চ ১০ মিলিয়ন ডলার পেয়ে থাকে। প্রস্তাবিত প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে প্রতিটি সদস্য দেশ ভবিষ্যতে সর্বোচ্চ ৪০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত পেত। কিন্তু ইউরোপীয় ফুটবলের প্রধান সংস্থা ইউয়েফাসহ বিভিন্ন শক্তিশালী দেশের তীব্র প্রতিবাদের মুখে ফিফা তাদের এই পরিকল্পনা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়।

প্রকল্পটি বাতিল হলেও বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা থামেনি। বিশেষ করে ইউরোপীয় ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফার জোরালো অবস্থানের কারণে বিষয়টি এখন বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক আলোচনার অংশ হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন তাবিথ। তিনি বলেন, ‘ইস্যুটি ইউয়েফার একটি স্ট্রং ভূমিকা রাখার কারণে জিওপলিটিক্যাল রূপ নিচ্ছে। এ কারণে ইসির সঙ্গে সঙ্গে আমাদের স্পোর্টস মিনিস্ট্রি এবং ফরেন মিনিস্ট্রির সঙ্গেও কথা বলতে হবে।’

সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বাফুফের নির্বাহী কমিটির সঙ্গে আলোচনা শেষে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অবস্থান আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে বলে জানিয়েছেন বাফুফে সভাপতি।

ফিফায় গৃহদাহ

আন্তর্জাতিক ফুটবলের রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে সর্বাত্মক গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে। সংস্থার প্রধান জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর ওপর ইউরোপীয় ফুটবলের প্রধান সংস্থা উয়েফার তীব্র চাপের মুখে এবার অত্যন্ত কড়া ও আক্রমণাত্মক বিবৃতি জারি করেছে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। ইনফান্তিনোকে পথচ্যুত করার পেছনে একটি ‘সংগঠিত ও চলমান চক্রান্ত’ কাজ করছে দাবি করে ফিফা সাফ জানিয়ে দিয়েছে, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সভাপতিকে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে সরানোর যেকোনো চেষ্টা শক্ত হাতে দমন করা হবে।

বিশ্বকাপের ২০ শতাংশ বাণিজ্যিক স্বত্ব বিক্রি করে ৪.২ বিলিয়ন ডলার তহবিলের এক বিতর্কিত প্রস্তাব ঘিরে যে সংকট শুরু হয়েছিল, তা এখন ক্ষমতার সরাসরি লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। ইনফান্তিনোর নেতৃত্বকে আর সমর্থনযোগ্য মনে করছে না উয়েফা। আগামী মার্চে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ফিফা সভাপতি নির্বাচনের আগেই ইনফান্তিনোকে পদচ্যুত করতে মরিয়া ইউরোপীয় ফুটবলের নীতিনির্ধারকরা।

শনিবারের বিবৃতিতে ফিফা সরাসরি উয়েফাকে লক্ষ্য করে মন্তব্য করেছে ‘যাদের ফিফার সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোর সমর্থন নেই, তাদের উচিত নয় কোনো অভিযোগ, ইঙ্গিত বা ভুল তথ্যের মাধ্যমে তা অর্জনের চেষ্টা করা, যা তারা ফিফার প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।’

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সদস্য দেশগুলোর ভোটে সভাপতি গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত হয়েছেন এবং তাদের দেওয়া ম্যান্ডেট নিয়েই দায়িত্ব পালন করছেন। ফিফার গঠনতন্ত্র ও প্রশাসনিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে সভাপতি নির্বাচন বা অপসারণ সংক্রান্ত কোনো প্রক্রিয়াকে বরদাশত করা হবে না। বিবৃতির শেষভাগে ফিফা সভাপতি ইনফান্তিনোর চেনা কৌশলে সংবাদমাধ্যমের ভূমিকার ওপরও ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়, ‘সাম্প্রতিক কিছু প্রতিবেদনে ভিত্তিহীন ও মিথ্যা তথ্য প্রচার করা হয়েছে। ফিফা যৌক্তিক গঠনমূলক সমালোচনাকে স্বাগত জানায়, তবে অবাস্তব অভিযোগ তৈরি করে অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করার সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না। ভুল সংবাদ প্রকাশিত হলে ফিফা তার সরাসরি ও কঠোর জবাব দেবে।’

ইনফান্তিনোকে ক্ষমতাচ্যুত করার এ লড়াইয়ে ২১১ সদস্য দেশের সমর্থন ও আঞ্চলিক কনফেডারেশনগুলোর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। উয়েফা বয়কটের হুমকি অব্যাহত রেখেছে এবং অনাস্থা প্রস্তাব পাসের চেষ্টা চালাচ্ছে। উয়েফার এ অবস্থানের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে কনকাকাফ। অন্যদিকে আফ্রিকা ইনফান্তিনোর পক্ষে সর্বসম্মতিক্রমে পূর্ণ সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। দক্ষিণ আমেরিকাও প্রকাশ্যে ইনফান্তিনোর পাশে দাঁড়িয়েছে এবং ভোটাভুটি ছাড়া সরানোর বিরোধিতা করেছে। আর এশিয়া কনফেডারেশনের একটি অংশ ইনফান্তিনোকে সমর্থন অব্যাহত রেখেছে।

ফিফার ২১১ সদস্য দেশের মধ্যে মাত্র ৪৩ দেশের সম্মতিতে জরুরি কংগ্রেস আহ্বান করা সম্ভব হলেও ইনফান্তিনোকে পদচ্যুত করতে অন্তত ১০৬ দেশের ভোটের প্রয়োজন হবে। আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার পূর্ণ সমর্থন থাকায় উয়েফার পক্ষে সেই ম্যাজিক ফিগারে পৌঁছানো অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত