ধানমন্ডির-৩২ নম্বরে পুলিশের সামনে আবারও ‘মব’!

  • সাংবাদিক ও রিকশা চালককে সন্দেহভাজন হিসেবে মারধর
  • শ্রদ্ধা জানাতে আসা এক যুবক আটক
আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ০৮:২২ পিএম

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ধানমন্ডির-৩২ নম্বর বাড়িতে শ্রদ্ধা জানাতে আসা এক যুবককে আটক করেছে পুলিশ।

তার নাম অর্ণব দাস (৪০)। তবে সন্দেহভাজন হিসেবে এক সাংবাদিক ও এক রিকশা চালকের উপর ‘মব’ সহিংসতা চালিয়েছে জুলাই যোদ্ধা পরিচয় দেওয়া কয়েকজন যুবক। যেকোন ধরনের অনাকাঙ্খিত ঘটনা এড়াতে সেখানে আগ থেকে অসংখ্য পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকলেও তাদের উপস্থিতিতেই দুজনকে বেধড়ক মারধর করা হয়। এসময় পুলিশের ভূমিকা ছিল নিষ্ক্রিয়।

পুলিশ মব সহিংসতার শিকার দুজনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। তবে তাদের সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় পরে ছেড়ে দেওয়া হয়।  আজ শনিবার সকাল থেকে দুপুর ১টার মধ্যে ঘটনাগুলো ঘটে। 

সকালের দিকে ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভেঙে ফেলা বাড়ির সামনে ফুল দিতে আসে এক যুবক। এসময় সাদা পোশাকে থাকা গোয়েন্দা পুলিশ সদস্যরা তাকে আটক করে পরিচয় ও ওখানে আসার কারণ জানতে চান। ওই যুবক তার নাম অর্ণব দাস বলে জানান এবং নিজেকে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন যুবলীগের কর্মী পরিচয় দেন। পরে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ তাকে গাড়িতে তুলে ধানমন্ডি থানায় নিয়ে যায়। 

আয়াসের নেতৃত্বে মব: রাষ্ট্র সংলাপ ফোরাম (এসডিএফ) নামে একটি সংগঠনের সদস্যসচিব আ ন ম আয়াসের নেতৃত্বে সকাল থেকে একদল যুবক ৩২ নম্বরে প্রবেশ সড়কে অবস্থান নেন। তারা নিজেদের জুলাই যোদ্ধা হিসেবে পরিচয় দেন। ছবি, ভিডিও ধারণ ও বিভিন্ন ব্যক্তিদের বক্তব্যে নিয়ে নিজ ফেসবুক পেইজে ও ইউটিউব চ্যানেলে পোস্ট করা ব্যক্তিদের বক্তব্য দিতে থাকেন আয়াস। তিনি ও তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলের নানা অনিয়ম, দুর্নীতি নিয়ে কথা বলেন ও স্লোগান তুলেন। এর মধ্যেই কাউকে সন্দেহ হলে তাকে মারধর করেন। 

দেখা যায়, দুপুর পৌনে ১২টার দিকে ৩২ নম্বরে প্রবেশ সড়কের মুখে একজন রিকশা চালক তার মোবাইল ফোনে ভিডিও ধারণ করছিলেন। একপর্যায়ে আয়াস ওই রিকশা চালকের কাছে যান এবং তার ফোন চেক করেন। রিকশাচালক ভিডিওটি যুবলীগের একজনকে পাঠিয়েছেন, এমন অভিযোগ তুলে মব সৃষ্টি করা হয়।

আয়াস ও তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিরা ওই রিকশা চালককে বেধড়ক মারধর করেন। এতে রিকশাচালক গুরুতর জখম হন। শরীরের বিভিন্ন স্থান ফুলে যায়। এসময় ঘটনাস্থলের পাশে পুলিশ, এপিবিএন সদস্য ও গোয়েন্দা পুলিশের অসংখ্য সদস্য থাকলেও তারা কেউ আসেনি এবং আয়াস ও তার লোকজনকে নিবৃত্ত করেনি। বরং কয়েক হাত দূরে বসে সেই দৃশ্য দেখতে থাকেন পুলিশ সদস্যরা। মারধরের শেষ পর্যায়ে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আসেন এবং ওই রিকশাচালককে আটক করে ধানমন্ডি থানায় নিয়ে যান। 

দুপুর ১২টার দিকে শিঙাড়া বিলি করছিলেন, এমন অভিযোগ তুলে আরেক ব্যক্তিকে মারধর করে আয়াস ও লোকজন। এ সময় ওই ব্যক্তির হাতে একটি বস্তা দেখা যায়, যার ভেতরে শিঙাড়া ছিল বলে অভিযোগ করেন মব সৃষ্টিকারীরা। মারধরের একপর্যায়ে ওই ব্যক্তিও দৌড়ে সেখান থেকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। 

এর কিছুক্ষণ পর আরেক ব্যক্তিকে দেখে তার পরিচয় জানতে চান সেখানে থাকা ব্যক্তিগত ফেসবুক পেইজে ও ইউটিউব চ্যানেলে খবরাখবর পোস্ট করা ব্যক্তিরা। তারা নিপু মিয়া ওই ব্যক্তিকে জেরা করতে থাকেন। জবাবে ওই ব্যক্তি একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালের সাংবাদিক বলে পরিচয় দেন। কিন্তু ইউটিউব চ্যানেলের লোকজন সেই পোর্টালের নিবন্ধন নাম্বার জানতে চান এবং অসংগতিমূলক প্রশ্ন করেন। এতে ওই ব্যক্তি ঘাবড়ে যান। তখন আয়াস ও তার লোকজন ওই ব্যক্তিকে বেধড়ক মারধর করেন। এতে তিনি জখমপ্রাপ্ত হন। পরে পুলিশ এসে তাকে থানায় নিয়ে যায়। 

মব সৃষ্টি করে যাকে-তাকে মারধরের বিষয়ে জানতে চাইলে আ ন ম আয়াস সাংবাদিকদের বলেন, নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ, যুবলীগের নেতাকর্মীরা যাতে কোনো অপতপরতা করতে না পারে সেজন্য তারা অবস্থান করছেন। কাউকে পেলে পুলিশের হাতে তুলে দিচ্ছেন। তার দাবি, তিনি যেটা করেছেন, সেটা মব নয়। কাউকে মারধর করে টাকা-পয়সা হাতিয়ে নিলে মব হতো। কিন্তু তিনি টাকা-পয়সা হাতিয়ে নিচ্ছেন না। তাই তার মতে, লোকজন নিয়ে মারধর করলেও সেটা মব নয়। 

এসময় তার পক্ষ নিয়ে ইউটিউব চ্যানেলের ব্যক্তিদের কাছে সাফাই বক্তব্য দেন ড. কাজী মনিরুজ্জামান মনির নামে এক ব্যক্তি। মনির নিজেকে তাঁতী দলের কেন্দ্রীয় আহ্বায়ক পরিচয় দেন এবং বলেন, কাউকে দলবদ্ধভাবে মারধর করে টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নিলে সেটা মব। কিন্তু আয়াস যেটা করছে, সেটা কোন অংশেই মব নয়। এসময় তিনি আয়াসের পিঠে হাত বুলিয়ে উৎসাহ দেন। 

জানতে চাইলে সন্ধ্যা ৭টায় ধানমন্ডি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম জানান, অর্ণব দাস নামে একজনকে আটক করা হয়েছে। তার বাড়ি টাঙ্গাইলে। তিনি নিজেকে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন যুবলীগের কর্মী বলে জানিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আরও দুজনকে থানায় আনা হয়েছিল। এদের একজন সাংবাদিক, আরেকজন রিকশাচালক। কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাদেরকে নিরাপত্তা দিতে মূলত থানায় আনা হয়েছে। তবে কোনো ধরনের মব সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করেন তিনি। তিনি বলেন, কেউ অভিযোগ করলে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে এবং ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

তবে মব এর বিষয়ে জানতে ডিএমপির উর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তাকে কল করলেও তারা রিসিভ করেননি। 
এদিকে ৩২ নম্বর বাড়ি ঘিরে ভোর থেকে ওই এলাকায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে পুলিশ। ধানমন্ডি থানা পুলিশের পাশাপাশি রিজার্ভ পুলিশ, এপিবিএন সদস্য, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সদস্যরা সাদা পোশাকে ছিলেন।

৩২ নম্বর সড়কে প্রবেশের দুই প্রান্তে ব্যারিকেড দিয়ে রাখা হয়। ব্যারিকেডের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকেন অসংখ্য পুলিশ সদস্য। ভেতরে ফুটপাতে চেয়ার পেতে বসে থাকতে দেখা যায় এপিবিএন সদস্যদের। এছাড়া বাড়ির সামনে লেক পাড়ে চেয়ার পেতে পোশাকে ও সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব পালন করতে দেখা গেছে।

বাড়ির সামনের সড়ক দিয়ে কাউকে ঢুকতে দেয়নি পুলিশ। ব্যারিকেডের ভেতরে ও মূল সড়কে এপিসি, জলকামান প্রস্তুত করে রাখা হয়। তবে সাধারণ লোকজনের সেখানে বেশ আনাগোনা ছিল। কেউ কেউ মূল সড়ক থেকে বঙ্গবন্ধুর বাড়ির ছবি ও ভিডিও ধারণ করেন। কেউ কেউ সেলফি তোলেন। ৩২ নম্বর থেকে পন্থপথ হয়ে কারওয়ান বাজারের দিকে আসা ও যাওয়ার সড়কেও পুলিশের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কিছু দূর পর পর পুলিশ ও পুলিশের গাড়ি দাঁড় করানো অবস্থায় দেখা গেছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত