২০২১ সালের ১৫ আগস্ট কাবুল দখলের মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ফেরে তালেবান। এরপর পাঁচ বছরে দেশটির নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে তালেবান শক্ত অবস্থান তৈরি করলেও নারী অধিকার, শিক্ষা, অর্থনীতি ও মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে সংকট আরও গভীর হয়েছে।
আফগানিস্তানের অর্থনীতি এখনো ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। জাতিসংঘের হিসাবে, দেশটির প্রায় ২ কোটি ২০ লাখ মানুষ—মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক, বেঁচে থাকার জন্য কোনো না কোনোভাবে বৈদেশিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। অর্থনৈতিক দুরবস্থার পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি একাধিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পাকিস্তানের সঙ্গে সংঘাত এবং প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে ফিরে আসা বিপুলসংখ্যক আফগান নাগরিকের চাপ মোকাবিলা করছে।
তবে ক্ষমতা ধরে রাখার ক্ষেত্রে তালেবান আগের চেয়ে শক্তিশালী হয়েছে। বিদেশভিত্তিক সশস্ত্র বিরোধী গোষ্ঠী ও ইসলামিক স্টেটের বিচ্ছিন্ন হামলা সত্ত্বেও দেশের ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ দৃঢ় হয়েছে। রাজস্ব আদায় বাড়ানোর পাশাপাশি চীন, রাশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও উজবেকিস্তানের সঙ্গে খনি, জ্বালানি ও অন্যান্য খাতে চুক্তি করছে তারা।
আন্তর্জাতিকভাবে তালেবান এখনো ব্যাপক স্বীকৃতি পায়নি। রাশিয়া একমাত্র দেশ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ ও চুক্তির মাধ্যমে তালেবান ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বাড়াচ্ছে। বিশ্বের ৪০টির বেশি আফগান দূতাবাসও বর্তমানে তালেবানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানা গেছে।
তালেবানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্পর্ক কীভাবে এগোবে, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ মানবাধিকার ও নারী অধিকারকে অগ্রাধিকার দিয়ে চাপ অব্যাহত রাখার পক্ষে, আবার কেউ আফগানিস্তানকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন না করে আলোচনার মাধ্যমে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আনার পক্ষে।
জাতিসংঘ গত পাঁচ বছর ধরে তালেবানের সঙ্গে অনিয়মিতভাবে যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে। মানবিক সহায়তা, মানবাধিকার, নারীর অধিকার, অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসন ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার জন্য নতুন প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। তবে তালেবানের কঠোর নীতিতে দৃশ্যমান পরিবর্তন না আসায় এই কৌশল কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এদিকে আফগানিস্তান নিয়ে আন্তর্জাতিক মনোযোগও কমেছে। ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বৈশ্বিক মনোযোগের বড় অংশ দখল করায় আফগান সংকট অনেকটাই আড়ালে চলে গেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানবিষয়ক বিশেষ দূত পদ বিলুপ্ত করার পাশাপাশি ইউএসএআইডিসহ কয়েকটি সংস্থার কার্যক্রম বন্ধ করেছে।
তালেবান ক্ষমতায় ফেরার পর ১২ বছরের বেশি বয়সী মেয়েদের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। নারীদের কর্মক্ষেত্র, চলাফেরা ও জনজীবনে অংশগ্রহণেও একের পর এক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। সাম্প্রতিক নিয়ম অনুযায়ী, নারীদের উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত ও বাণিজ্য মেলায় প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও পুরুষের সহায়তা নেওয়ার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে।
অন্যদিকে, কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যেও কিছু নারী ঘরে বসে বা সীমিত পরিসরে ব্যবসা ও কর্মসংস্থান চালিয়ে যাচ্ছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সংস্থাও নারীদের কাজের সুযোগ বজায় রাখতে বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা করছে।
সব মিলিয়ে পাঁচ বছরে তালেবান আফগানিস্তানে তাদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ সুসংহত করতে পারলেও নারীদের শিক্ষা ও অধিকার, মানবিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রশ্নে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, শুধু আন্তর্জাতিক চাপ বা বিচ্ছিন্নতার মাধ্যমে পরিবর্তন আনা কঠিন; আবার তালেবানকে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক সম্পর্কের সুযোগ দেওয়াও নারী ও মানবাধিকারের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ তাই এখনো অনিশ্চিত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ হলো—তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেও কীভাবে নারী অধিকার, মানবাধিকার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শাসনের বিষয়ে কার্যকর চাপ তৈরি করা যায়।
তালেবান শাসনের পাঁচ বছর, এখনও অধিকারবঞ্চিত আফগান নারীরা