কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ, সালিসে বিচার সাতবার কান ধরে উঠবস!

কিশোরীর বড় ভাই বলেন, বিষয়টি জিজ্ঞেস করতেই জাহিদুল আমার উপর চড়াও হন। এক পর্যায়ে আমার উপর হামলা করে মারধর করেন। এঘটনায় কোনো মামলা করলে পরিস্থিতি ভয়নাক হবে বলেও হুমকি দেন।

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২৬, ০৯:০৮ পিএম

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায় আপন চাচাতো ভাইয়ের বিরুদ্ধে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাটি আইনের আওতায় না এনে স্থানীয় প্রভাবশালীরা সালিশ বসিয়ে মাত্র সাতবার কান ধরে উঠবস করানোর ‘শাস্তি’ দিয়ে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করেছেন। এতে ভুক্তভোগী কিশোরীর নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও স্থানীয় সালিসব্যবস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ভুক্তভোগী কিশোরীকে গতকাল সোমবার (১৭ আগস্ট) বিকেলে চিকিৎসার জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে কিশোরীর প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও আলামত সংগ্রহ করেছেন।

অভিযুক্তের নাম জাহিদুল ইসলাম (২৪)। তিনি নাসিরনগর উপজেলার ফান্দাউক ইউনিয়নের বাসিন্দা।  তিনি পেশায় একজন প্রসাধন (কসমেটিকস) ব্যবসায়ী। ঘটনার পর থেকে জাহিদুল পলাতক রয়েছেন।

ভুক্তভোগীর পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত শনিবার রাত নয়টার দিকে জাহিদুল ওই কিশোরীকে প্রলোভন দেখিয়ে বাড়ির পাশের একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যান। সেখানে একটি পরিত্যক্ত ঘরে ওই কিশোরীকে ধর্ষণ করা হয়। বিষয়টি কাউকে জানাতে কিশোরীকে প্রাণনাশের হুমকি দেন অভিযুক্ত তরুণ। কিশোরী ঘটনাটি বড় বোনকে বিষয়টি অবগত করে। পরে বিষয়টি জানাজানি হয়। 

পরে রবিবার সকালে কিশোরীর বড় ভাই অভিযুক্ত জাহিদুলকে বিষয়টি জিজ্ঞাসা করেন। এতে অভিযুক্ত তরুণ উল্টো চড়াও হন এবং কিশোরীর বড় ভাইকে মারধর করেন। এক পর্যায়ে মামলা করলে পরিণাম খারাপ হবে বলে হুমকিও দেন। কিশোরীর পরিবার বিষয়টি স্থানীয় গ্রাম সর্দারদের জানান। গতকাল সেমাবার সকাল নয়টার দিকে সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য শেখ ফাহিমা বেগমের উপস্থিতি বিষয়টি নিয়ে গ্রামে সালিস হয়। সালিসে অভিযুক্ত জাহিদুলকে মাত্র ৭ বার কান ধরে উঠবস করানোর মাধ্যমে ঘটনাটি দায়সারা রায় দিয়ে ধামাচাপা দেওয়া হয়। কিন্তু ভুক্তভোগী কিশোরীর পরিবার এই রায়ে অসন্তুষ্ট হন এবং সালিশের বিচার প্রত্যাখ্যান করেন। 

পরে কিশোরীকে নিয়ে প্রথমে নাসিরনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যান। সেখান থেকে পুলিশের পরামর্শে পরে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য কিশোরীকে সোমবার বিকেল চারটার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে ভর্তি করা হয়।

কিশোরীর বড় ভাই বলেন, বিষয়টি জিজ্ঞেস করতেই জাহিদুল আমার উপর চড়াও হন। এক পর্যায়ে আমার উপর হামলা করে মারধর করেন। এঘটনায় কোনো মামলা করলে পরিস্থিতি ভয়নাক হবে বলেও হুমকি দেন। পরে বিষয়টি স্থানীয় সর্দারদের অবগত করি। কিন্তু তারা সাতবার উঠবস করিয়েই ঘটনা ধামাচাপা দেন। এই রায়ে আমি সন্তুষ্ট নয় এবং রায় প্রত্যাখান করেছি। বোনকে নিয়ে হাসপাতালে আছি। এঘটনায় আমি মামলা দায়ের করব। আমি খুব সহজ-সরল প্রকৃতির। এই সুযোগ নিয়ে জাহিদুল এমন জঘন্য কাজ করেছে। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

হাসপাতালের গাইনি বিভাগের সিনিয়র স্টাফ নার্স খালেদা আক্তার বলেন, কিশোরীকে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। তার সোয়াব ও প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রতিবেদনের পর ধর্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।

একাধিকবার চেষ্টা করে মুঠোফোন না ধরায় অভিযুক্ত জাহিদুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য শেখ ফাহিমা বেগম বলেন, এটা দশে বইয়্যা বিচার করছে। আর ধর্ষণের ঘটনা তো আমি চোখে দেখিনি। কইতারতাম না, আল্লাহ জানে। আমি দেখছি ও না, আমি সাক্ষীও না।

নাসিরনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ শাহিনুল ইসলাম বলেন, স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য কিশোরীকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এঘটনা মামলা দিতে কিশোরীর পরিবারকে বলা হয়েছে। অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত