চিকিৎসা শেষে ফেরার কথা ছিল, ফিরলেন কফিনে

চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন এস এম আলিমুজ্জামান সাজু। কলকাতার হোটেলের অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারানোর পর দীর্ঘ অপেক্ষা শেষে তার মরদেহ ফিরল নিজ গ্রামে।

আপডেট : ২৩ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৪৬ এএম

চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে দেশে ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন সাতক্ষীরার কালীগঞ্জের এস এম আলিমুজ্জামান সাজু। পরিবারের স্বজনরাও প্রিয় মানুষটির ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন। কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান হয়েছে এক নিথর দেহ হয়ে। কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে নিহত সাজুর মরদেহ দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে পৌঁছেছে নিজ গ্রামে।

শনিবার (২২ আগস্ট) দুপুর ১২টা ১৪ মিনিটে ভারতের ঘোজাডাঙ্গা স্থলবন্দর দিয়ে সাজুর মরদেহবাহী গাড়ি বাংলাদেশের ভোমরা স্থলবন্দরে প্রবেশ করে। আইনি ও প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে দুপুরেই ভোমরা ইমিগ্রেশন থেকে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

মরদেহ হস্তান্তরের সময় সীমান্তে ছিল শোকাবহ পরিবেশ। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সমঝোতায় নীল পতাকা উড়িয়ে সম্পন্ন হয় প্রক্রিয়াটি। ভারতের বিএসএফের পক্ষ থেকে এসআই পাচা কাটা মরদেহটি বাংলাদেশের বিজিবির কোম্পানি কমান্ডার আফজাল হোসেন ও ভোমরা ইমিগ্রেশনের অফিসার ইনচার্জ সজীব বালার কাছে তুলে দেন। পরে ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছ থেকে ভাইয়ের মরদেহ গ্রহণ করেন সাজুর ভাই মাহমুদুন্নবী দিপু।

এ সময় সীমান্তে উপস্থিত ছিলেন সাজুর ভাই, বিএনপি নেতা ও সাবেক মেয়র তাসকিন আহমেদ চিশতী, প্রভাষক আমিনুর রহমান, মমিনুর রহমানসহ এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিরা।

সীমান্তে দাঁড়িয়ে সাজুর ভাই মমিনুর রহমান বলেন, ভারত ও বাংলাদেশ প্রতিবেশী ও ভাতৃপ্রতিম দেশ। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ চিকিৎসার জন্য ভারতে যান। সেখানে যাওয়া বাংলাদেশি পর্যটক, ব্যবসায়ী ও স্বাস্থ্যসেবা প্রার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখার জন্য ভারত সরকারের প্রতি আবেদন জানান তিনি।

সাবেক মেয়র তাসকিন আহমেদ চিশতী বলেন, প্রতিবেশী দুই দেশের সীমান্তে মরদেহ গ্রহণের জটিলতা ও সময় কমানো প্রয়োজন। প্রক্রিয়াটি সহজ ও দ্রুত হলে স্বজনদের দীর্ঘ অপেক্ষা ও কষ্ট কিছুটা কমবে।

এর আগে গত বুধবার (১৯ আগস্ট) রাতে কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ নামের একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নয় বাংলাদেশি নিহত হন। তাদের মধ্যে সাতক্ষীরার ছিলেন দুজন। চিকিৎসা শেষে দেশে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন সাজু। কিন্তু পরদিনই স্বজনদের কাছে আসে তার মৃত্যুর খবর।

একই ঘটনায় নিহত হন কালীগঞ্জ উপজেলার তারালী ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া গ্রামের গৃহবধূ রেবতী সরকার। চিকিৎসার জন্য প্রায় ১০ দিন আগে তিনি ভারতে গিয়েছিলেন। তার স্বামী ও দুই সন্তান ভারতে অবস্থান করায় স্বজনদের সম্মতিতে শুক্রবার কলকাতার নিমতলা ঘাটে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

রেবতীর দেবর তপন সরকার বলেন, শনিবার দেশে ফেরার কথা ছিল তার দাদা ও বৌদির। কিন্তু অগ্নিকাণ্ড সবকিছু কেড়ে নেয়। ছেলে-মেয়েরা ভারতে থাকায় দাদাসহ নিমতলা ঘাটেই বৌদির শেষকৃত্যের আয়োজন করা হয়।

শনিবার বিকেলে সাজুর মরদেহ তার জন্মস্থান কালীগঞ্জ উপজেলার বরেয়া গ্রামে পৌঁছালে এলাকায় শোকের পরিবেশ নেমে আসে। অবিবাহিত সাজু ছিলেন মিষ্টভাষী ও সফল ব্যবসায়ী। এলাকায়ও তার জনপ্রিয়তা ছিল। তার আকস্মিক মৃত্যুতে কান্নায় ভেঙে পড়েন হাজারো গ্রামবাসী।

স্থানীয় তারালী ইউপি সদস্য এনামুল হক বলেন, সাজু তার ছোট ভাইয়ের মতো ছিলেন। নতুন বাড়ি তৈরি করে বিয়ে করে সংসার গড়ার স্বপ্ন ছিল তার। কিন্তু কলকাতার আগুনে সেই স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। যে বাড়িতে শান্তিতে থাকার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই বাড়ির সামনেই তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করতে হয়েছে।

বরেয়া গ্রামের স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাবিনা খাতুন এবং জাতীয় দলের তারকা ক্রিকেটার ও একই এলাকার সন্তান ‘কাটার মাস্টার’ মুস্তাফিজুর রহমান সাজুর জানাজায় অংশ নেন। তারা গভীর শোক প্রকাশ করেন।

সাজুর মরদেহ দেখতে এসে প্রধান শিক্ষক সাবিনা খাতুন বলেন, সাজু তাদের চোখের সামনে বড় হওয়া একজন রত্ন ছিলেন। তার হাসিমুখ ও সামাজিক কর্মকাণ্ড সবার অনুপ্রেরণা ছিল। জীবনের নতুন অধ্যায় শুরুর স্বপ্ন দেখেছিলেন তিনি। এত দ্রুত তার চলে যাওয়া পুরো গ্রামের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।

জানাজায় অংশ নিয়ে মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ঘরের ছেলে সাজু ভাই এভাবে চলে যাবেন, তা মেনে নেওয়া খুব কষ্টের। চিকিৎসার জন্য গিয়ে আর জীবিত ফিরতে পারেননি তিনি। এ ঘটনাকে হৃদয়বিদারক উল্লেখ করে সাজুর বিদেহী আত্মার শান্তি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান তিনি।

বাদ আসর বরেয়া গ্রামের মাঠে হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে সাজুর জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে স্বজনদের কান্না ও পুরো গ্রামের শোকের মধ্যে নিজ গ্রামের মাটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয় এস এম আলিমুজ্জামান সাজুকে।

একটি অগ্নিকাণ্ড মুহূর্তেই সাজুসহ দুই প্রাণ কেড়ে নিল। একই সঙ্গে দুই পরিবারে রেখে গেল দীর্ঘস্থায়ী শোকের ভার।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত