ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যৌথভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছেন ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের সাবেক ১০২ জন কূটনীতিক। তাদের দাবি, দখল করা ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের বর্তমান নীতি ভবিষ্যতে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাই স্থায়ীভাবে নষ্ট করে দিতে পারে। খবর আলজাজিরার।
শনিবার (২২ আগস্ট) ফরাসি সংবাদমাধ্যম ল্য মোঁদে প্রকাশিত এক খোলা চিঠিতে এ আহ্বান জানানো হয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনে আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখতে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যকে একসঙ্গে পদক্ষেপ নিতে হবে। একই সঙ্গে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি নাগরিকদের সমান অধিকারের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
চিঠিতে স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে জাতিসংঘে যুক্তরাজ্যের সাবেক রাষ্ট্রদূত জেরেমি গ্রিনস্টক ও এমির জোনস প্যারি রয়েছেন। ফ্রান্সের সাবেক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক পরিচালক ইয়ভেস অউবিন দ্য লা মেজুরিয়ের ও দেনি বোশারও এতে স্বাক্ষর করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে দীর্ঘদিন কূটনৈতিক দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে এসব সাবেক কর্মকর্তার।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ধ্বংস এবং ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ব্যাপক সহিংসতা, যা ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহযোগিতায় ঘটছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে, তা জাতিগত নিধনের শামিল। এতে আরও বলা হয়, বিশ্ব এখন ইসরায়েলকে আর প্রকৃত গণতন্ত্র হিসেবে দেখছে না।
ইরান, কাতার ও ইয়েমেনে যুক্তরাজ্যের সাবেক রাষ্ট্রদূত নিকোলাস হপটনও চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন। তিনি আল-জাজিরাকে বলেন, এসব শব্দ সাবেক কূটনীতিকদের নিজেদের তৈরি নয়। আন্তর্জাতিক আইনি সংস্থা, জাতিসংঘ এবং নিরপেক্ষ অবস্থান থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য থেকেই এসব ভাষা নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন সংঘাতের দীর্ঘস্থায়ী পরিস্থিতির মধ্যেই এই চিঠি প্রকাশ করা হলো। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও এরপরও ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকার অভিযোগ রয়েছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও অন্তত ১ হাজার ২৮৫ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
নিকোলাস হপটনের মতে, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের নতুন করে বসতি সম্প্রসারণের উদ্যোগই এই চিঠির অন্যতম তাৎক্ষণিক কারণ। তার আশঙ্কা, পশ্চিম তীরে এমনভাবে নতুন বসতি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে সেখানে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ প্রায় অসম্ভব করে দিতে পারে।
লিবিয়ায় যুক্তরাজ্যের সাবেক রাষ্ট্রদূত পিটার মিলেট বলেন, এই চিঠির মাধ্যমে কেবল বক্তব্য বা সমালোচনার পরিবর্তে বাস্তব পদক্ষেপের দাবি জানানো হয়েছে।
তার ভাষায়, গত কয়েক মাস ও বছরে বিভিন্ন মন্ত্রী ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা ও নিন্দা করেছেন। এখন বাণিজ্য, বসতি স্থাপন ও গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে অস্ত্র বাণিজ্য বন্ধ করারও দাবি জানান তিনি।
২০২৫ সালে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়। চিঠিতে বলা হয়েছে, এই স্বীকৃতিকে এখন জরুরি পদক্ষেপের মাধ্যমে বাস্তবে কার্যকর করতে হবে।
সাবেক কূটনীতিকরা আরও বলেন, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ফিলিস্তিন, সিরিয়া ও লেবাননের ওপর ব্রিটেন ও ফ্রান্সের যে ম্যান্ডেট বা প্রশাসনিক দায়িত্ব ছিল, তার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই দেশের ঐতিহাসিক দায়িত্বের সম্পর্ক রয়েছে। ওই সময়কার সিদ্ধান্তগুলোই মধ্যপ্রাচ্যের আধুনিক সীমান্ত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
চিঠিতে বলা হয়, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য যারা দায়ী, তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। তা না হলে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য নিজেদের দ্বৈত নীতির অভিযোগ থেকে মুক্ত করতে পারবে না।
ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন সাবেক কূটনীতিকরা। এর মধ্যে রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইসরায়েলের মধ্যকার বাণিজ্য চুক্তি স্থগিত করা এবং যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের মধ্যকার বাণিজ্য চুক্তি বন্ধ করা।
এ ছাড়া ইসরায়েলে অস্ত্র সরবরাহ ও সামরিক সহযোগিতা বন্ধের আহ্বান জানানো হয়েছে। ইসরায়েলি বসতিতে উৎপাদিত পণ্যের সঙ্গে বাণিজ্য নিষিদ্ধ করা এবং অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে নাগরিকদের সম্পত্তি কেনার ওপর নিষেধাজ্ঞারও দাবি জানানো হয়েছে।
গাজায় জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএসহ অন্যান্য জাতিসংঘ সংস্থার মাধ্যমে মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে সাংবাদিক, কূটনীতিক ও আইনপ্রণেতাদের জন্য নিরাপদ ও সুরক্ষিত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, আইন ভঙ্গের জন্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে আইনের শাসন রক্ষা করা সম্ভব হবে এবং সহিংসতার বিকল্প পথও দেখানো যাবে।
পিটার মিলেট আরও বলেছেন, তার সরকারকে আরও কঠোর অবস্থান নিতে হবে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন এবং ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেওয়ার কথাও বলেছেন তিনি।
তার অভিযোগ, ফিলিস্তিনিদের জর্ডান নদী পেরিয়ে জর্ডানে চলে যেতে বাধ্য করার চেষ্টা চলছে। জর্ডান দীর্ঘদিনের পশ্চিমা মিত্র হওয়ায় বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মিলেট বলেন, ইসরায়েল যখন প্রকাশ্যেই দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান মেনে নেবে না বলে জানাচ্ছে, তখন এমন পরিস্থিতি চলতে দেওয়া যায় না।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এই চাপকে গুরুত্ব দিচ্ছেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে মিলেট সংশয় প্রকাশ করেন। তবে তার মতে, অর্থনৈতিক চাপের প্রভাব থাকলে পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসতে পারে। ইসরায়েলের সমৃদ্ধির ওপর বাণিজ্যিক পদক্ষেপ প্রভাব ফেলতে পারলে তা দেশটির ভেতরেও কিছুটা প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তবে খোলা চিঠিটি শুধু ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বানেই সীমাবদ্ধ নয়। এতে ফিলিস্তিনি নেতৃত্বেরও সমালোচনা করা হয়েছে। ফিলিস্তিনি নেতৃত্বকে ‘জনপ্রতিনিধিত্বহীন ও অকার্যকর’ হিসেবে উল্লেখ করে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে। নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনকে নতুন করে পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবেও দেখা হয়েছে।
নিকোলাস হপটনের মতে, শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে সরকারগুলো শুধু নিন্দা জানাবে, নাকি বাস্তবে পদক্ষেপ নেবে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পক্ষ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
তার মতে, ইসরায়েলি সরকারের কর্মকাণ্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বেশি প্রভাব রয়েছে। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে আরও দীর্ঘস্থায়ী ও সমাধান করা কঠিন সংকট তৈরি হতে পারে, যার পরিণতিতে নতুন সহিংসতা ও প্রাণহানির আশঙ্কা থাকবে।
গাজা নিয়ে ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনায় রাজি হচ্ছে না ইসরায়েল
ইসরায়েল কি সত্যিই ছেড়ে দিচ্ছে লেবাননের ভূখণ্ড?