ফেনীর সোনাগাজীর মাদরাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন), আপিল এবং জেল আপিলের ওপর আজ রায় ঘোষণার দিন ধার্য রয়েছে। সোমবার (২৪ আগস্ট) হাইকোর্টের বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী এবং বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ রায় ঘোষণা করবেন।
আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে এই মামলা শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির। আসামি পক্ষে শুনানি করেন সিনিয়র আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী, এস এম শাহজালাল, এস এম মাসুদ হোসেন দোলন, মোহাম্মদ শিশির মনির ও অন্য আইনজীবীরা।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে ২০১৯ সালের ২৬ মার্চ মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলা তার অফিসে ডেকে নিয়ে শ্লীলতাহানি করেন। পরদিন নুসরাতের মা শিরিন আক্তার সোনাগাজী মডেল থানায় অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলাকে আসামি করে মামলা করেন। পুলিশ সেদিনই তাকে গ্রেপ্তার করে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, শ্লীলতাহানির মামলায় মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার অনুগতরা ক্ষিপ্ত হন। ৬ এপ্রিল নুসরাতকে মাদ্রাসার প্রশাসনিক ভবনের ছাদে ডেকে নেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, বোরকা পরা পাঁচ দুর্বৃত্ত তার হাত-পা বেঁধে শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয়। ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নুসরাতের মৃত্যু হয়।
রায়কে ঘিরে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে নুসরাতের সোনাগাজীর বাড়িতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। পাশাপাশি স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপরও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
এ রায় প্রসঙ্গে সোনাগাজী মডেল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসিম বলেন, নুসরাত হত্যা মামলার আপিলের রায়কে কেন্দ্র করে তার ভাই মাহমুদুল হাসান নোমানের আবেদনের প্রেক্ষিতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পূর্বে তাদের বাড়িতে দুইজন পুলিশ সর্বদা নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত ছিল, বর্তমানে সেখানে আরও ৭ পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়। এছাড়াও এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
নিরাপত্তা বিঘ্ন ঘটার কোনো শঙ্কার রয়েছে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, এখন পর্যন্ত আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির কোনো তথ্য নেই। বাড়তি নিরাপত্তা জোরদার করায় নুসরাতের পরিবার স্বস্তিতে আছে।
নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বলেন, একমাত্র মেয়েকে হারিয়ে আজও আমি পাগলের বেশে আছি। নিম্ন আদালতে বিচার চেয়ে আমরা ন্যায় বিচার পেয়েছি। এখনও আমার ৩ ছেলেকে নিয়ে নিরাপত্তা শঙ্কায় আছি। পুলিশ আমাদের নিরাপত্তা দিচ্ছে। বর্তমান সরকারের কাছেও প্রত্যাশা ন্যায় বিচার প্রাপ্তিতে সহযোগিতা এবং আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। আশাকরি উচ্চ আদালতেও আমারা ন্যায় বিচার পাবো।
নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়ে নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বলেন, আমরা চাই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় পূর্বের রায় বহাল থাকবে। হত্যায় জড়িত আসামিরা আইনের ফাঁকফোকরে কৌশলে যেন পার পেয়ে না যায়। আমাদের একটাই দাবি ন্যায়বিচার। রায়কে কেন্দ্র করে বাড়তি নিরাপত্তা জোরদার করায় আমরা সন্তুষ্ট। তবে শঙ্কামুক্ত নই, কারণ বিভিন্ন প্রয়োজনে বাড়ির বাইরে যেতে হয়।
নুসরাত হত্যা মামলায় ২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর রায় দেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। সে রায়ে ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ১৬ আসামি হলেন- সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা, সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সভাপতি রুহুল আমিন, সোনাগাজী পৌরসভার কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম, মাদ্রাসা শিক্ষক হাফেজ আবদুল কাদের, প্রভাষক আফসার উদ্দিন, মাদ্রাসা ছাত্র নুর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, কামরুন নাহার মণি, উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহি উদ্দিন শাকিল।
নুসরাত হত্যা মামলায় হাইকোর্টের রায় সোমবার
নুসরাত হত্যা মামলা: হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানি শুরু