ডিআর কঙ্গোতে ইবোলা: আক্রান্ত ৫,৫১৫, মৃত্যু বেড়ে ২,৬৪২

আপডেট : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১০:৫৬ এএম

ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে (ডিআর কঙ্গো) ইবোলা পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। দেশটির সর্বশেষ সরকারি হিসাবে, ইবোলায় আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫১৫ জনে। এ পর্যন্ত মারা গেছেন ২ হাজার ৬৪২ জন। রবিবার প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়েছে, ইতুরি ও নর্থ কিভু প্রদেশে নতুন করে ৫১টি সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে।

মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে শুরু হওয়া এ প্রাদুর্ভাবটি ডিআর কঙ্গোর ইতিহাসে ১৭তম ইবোলা মহামারি এবং দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ইবোলা প্রাদুর্ভাব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এটিকে সর্বোচ্চ সতর্কতা স্তর ‘পাবলিক হেলথ ইমার্জেন্সি অব ইন্টারন্যাশনাল কনসার্ন’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এর আওতায় প্রতিবেশী উগান্ডাকেও রাখা হয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এ প্রাদুর্ভাব ২০১৪-২০১৬ সালে পশ্চিম আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়া ইবোলা মহামারিকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে। ওই মহামারিতে ১১ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন।

ডিআর কঙ্গোর সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জুনের শুরুতে যেখানে ইবোলায় মৃত্যুহার ছিল প্রায় ২০ শতাংশ, বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ৪৮ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ আক্রান্ত প্রতি দুজনের মধ্যে প্রায় একজন মারা যাচ্ছেন।

তবে সংক্রমিত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসা মানুষদের শনাক্ত ও পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। জুনে যেখানে কন্টাক্ট ট্রেসিংয়ের হার ছিল ৩০ শতাংশ, এখন তা বেড়ে ৮৫ শতাংশের বেশি হয়েছে।

ইবোলা মোকাবিলায় নিয়োজিত স্বাস্থ্যকর্মীরাও ব্যাপক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। ডব্লিউএইচওর হিসাবে, প্রায় ১৬০ জন স্বাস্থ্যকর্মী সংক্রমিত হয়েছেন এবং তাদের মধ্যে প্রায় ৪৫ জন মারা গেছেন।

সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি এ প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আক্রান্ত প্রদেশগুলোতে সশস্ত্র সংঘাত, মানুষের বাস্তুচ্যুতি, স্বাস্থ্যকর্মী ও চিকিৎসাকেন্দ্রে হামলা, মানুষের ব্যাপক চলাচল এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর ঘাটতির কারণে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের কাজ ব্যাহত হচ্ছে।

ডিআর কঙ্গোতে পৌঁছেছে টিকা

ইবোলার এই ধরনটি ‘বুনদিবুগিও’ (Bundibugyo) নামে পরিচিত। এই ধরনের ইবোলার বিরুদ্ধে এখনো কোনো অনুমোদিত টিকা বা চিকিৎসা নেই। অতীতে ইবোলার বিভিন্ন প্রাদুর্ভাবে কার্যকর প্রমাণিত ‘এরভেবো’ (Ervebo) টিকা অবশ্য এই প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রাণীর ওপর পরিচালিত প্রাথমিক পরীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, বুনদিবুগিও ইবোলার বিরুদ্ধেও টিকাটি কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ডব্লিউএইচও ডিআর কঙ্গোর জন্য ৭০ হাজার ডোজ এরভেবো টিকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এর মধ্যে শুক্রবার দেশটিতে পৌঁছেছে ১৬ হাজার ২৫০ ডোজ।

ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম গেব্রেয়েসুসসহ সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলেছেন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ডিআর কঙ্গোয় চলমান কার্যক্রম দুই থেকে তিন গুণ বাড়াতে হবে। আক্রান্ত প্রতিটি এলাকায় দ্রুত পৌঁছানো এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের আরও ভালো সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে।

সামনের সারির স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জাম, সময়মতো পারিশ্রমিক, দ্রুত রোগ নির্ণয়ের সুযোগ এবং আক্রান্ত হলে উন্নতমানের সহায়ক চিকিৎসা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

আফ্রিকা সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আবদুসসালামি নাসিদি আলজাজিরাকে বলেছেন, পরিস্থিতি ‘নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে’। তার মতে, দুর্বল সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কর্তৃপক্ষের আস্থার সংকট সংক্রমণ অব্যাহত থাকার অন্যতম কারণ।

নাসিদি বলেন, এটি এখন আর শুধু জাতীয় বা আঞ্চলিক সমস্যা নয়; এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। কম রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন প্রতিবেশী এলাকায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

ডব্লিউএইচও বর্তমানে বৈশ্বিক জনগোষ্ঠীর জন্য ঝুঁকিকে ‘কম’ হিসেবে মূল্যায়ন করলেও ডিআর কঙ্গোর অভ্যন্তরে ঝুঁকি এখনো ‘অত্যন্ত বেশি’ বলে জানিয়েছে।

তবে পরিস্থিতির মধ্যে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতিও রয়েছে। উগান্ডা এবং ডিআর কঙ্গোর ইতুরি ও সাউথ কিভুর কয়েকটি স্বাস্থ্য অঞ্চলে সংক্রমণের ধারাবাহিকতা বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, কার্যকর নেতৃত্ব এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সহযোগিতার মাধ্যমে ইবোলার সংক্রমণ শৃঙ্খল ভেঙে দেওয়া সম্ভব—এ ঘটনাকে তারই প্রমাণ হিসেবে দেখছে ডব্লিউএইচও।

বিশ্ববাসীর প্রতি পোপের আহ্বান

রবিবার ভ্যাটিকানে প্রার্থনার সময় ডিআর কঙ্গোর পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন পোপ লিও। ইবোলা মহামারির বিস্তারে বহু মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন উল্লেখ করে তিনি আক্রান্ত দেশটির জন্য প্রার্থনা করেন।

পোপ লিও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে প্রতিরোধ কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করে এমনভাবে সাড়া দিতে হবে, যাতে যত বেশি সম্ভব মানুষের জীবন রক্ষা করা যায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত