বড় এক গম্বুজ, সুউচ্চ মিনার, পিলারবিহীন সুবিশাল অভ্যন্তর আর তুর্কি স্থাপত্যশৈলীর নান্দনিকতা সব মিলিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ ক্যাম্পাসের অন্যতম অনন্য স্থাপনা। প্রায় তিন একর জায়গাজুড়ে নির্মিত এই মসজিদ শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ইবাদতের স্থান নয় বরং এর সৌন্দর্য ও স্বতন্ত্র স্থাপত্যশৈলীর কারণে দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের কাছেও এটি আকর্ষণের কেন্দ্র।
প্রায় পাঁচ দশক ধরে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন, ইসলামি জ্ঞান, দর্শন, সংস্কৃতি ও চর্চার পাশাপাশি রাবির নান্দনিকতায়ও নিজস্ব অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে মসজিদটি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক পেরোতেই চোখে পড়ে প্রশাসনিক ভবন। এ ভবনের ডান দিকে একটু সামনে গেলেই চোখে পড়ে মুসলিম স্থাপত্যের আদলে নির্মিত সুউচ্চ মিনার। এর পাশেই অবস্থিত কেন্দ্রীয় মসজিদটি। কারুকার্যে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন এই মসজিদটি ক্যাম্পাসের সৌন্দর্য বাড়িয়ে সৃষ্টি করেছে এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ের।
মসজিদে ঢুকতেই প্রাণ জুড়িয়ে যায় মুসল্লিদের। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীসহ নামাজ পড়তে আসেন হাজারও মুসল্লি। মসজিদের সৌন্দর্য বাড়াতে চারদিকে স্থাপন করা হয়েছে লাইটপোস্ট। নির্মাণ করা হয়েছে বিভিন্ন স্থাপনাও।
সুবিশাল অভ্যন্তরীণ এই মসজিদে নেই কোনো পিলার। মূল কাঠামোর মধ্যবর্তী স্থানে ওপরে নির্মাণ করা হয়েছে বিশালাকার গম্বুজ। শ্বেত-শুভ্র ঝাড়বাতিগুলো এতই মনোরম যে নির্মাণের প্রতিটি স্তরের সঙ্গে তা একেবারে মিশে গেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় কার্যালয় জানায়, ১৯৭০ সালের ১৩ এপ্রিল প্রায় তিন একর জায়গায় এই মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং শেষ হয় ১৯৭৪ সালের মার্চ মাসে। এর মূল কাঠামোর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ৫২ গজ। তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ঢাকার বায়তুল মোকাররম মসজিদের নকশাপ্রণেতা ‘থারিয়ানি’র নকশার আলোকে এর নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯৭৪ সালের মার্চ মাসে।
রাবির কেন্দ্রীয় জামে মসজিদটির নির্মাণব্যয় তৎকালীন সময়ে ৩ লাখ ৭৪ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তবে পরে কাজ শেষ করতে ব্যয় হয়েছিল প্রায় আট লাখ টাকা। মসজিদের বারান্দা ও বারান্দার বাইরের যে অংশ রয়েছে, তা মূল কাঠামোর প্রায় দ্বিগুণ। মূল ভবনের অভ্যন্তরে প্রায় ৫০০ মুসল্লির ধারণক্ষমতা রয়েছে। তবে বাইরের ফাঁকা জায়গাসহ এই মসজিদে প্রায় আড়াই হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন।
মসজিদের আঙিনাকে মূল ক্যাম্পাস থেকে পৃথক রাখা ও পবিত্রতা রক্ষার্থে চারপাশে রয়েছে দেয়াল। আঙিনা জুড়ে রয়েছে সারিবদ্ধ ঝাউগাছ। দক্ষিণ-পূর্ব পাশে রয়েছে ফোয়ারা, নারী-পুরুষের জন্য পৃথক অজুখানা, অফিসকক্ষ, শৌচাগার ও ইমামের থাকার ব্যবস্থা। এছাড়া রয়েছে হরেক রকমের ফলের গাছ ও ঈদগাহ।
মসজিদটির প্রতিষ্ঠাতা ইমাম ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মাওলানা জামাল উদ্দিন। মসজিদে একজন সিনিয়র পেশ ইমাম ও একজন মুয়াজ্জিন দায়িত্ব পালন করছেন। মসজিদের সার্বিক তত্ত্বাবধানের জন্য রয়েছেন দুজন সহকারী রেজিস্ট্রার ও একজন সেকশন অফিসার।
মসজিদের অজুখানার পাশেই রয়েছে সমৃদ্ধ পাঠাগার। পাঠাগারটি মুসল্লিদের জন্য আসরের নামাজের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত খোলা থাকে।
মসজিদের সৌন্দর্য তুলে ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদটি অনেক সুন্দর। প্রতিদিন এখানে শত শত মুসল্লির সমাগম হয়। ক্যাম্পাসে যারা ঘুরতে আসেন, তারা একবার হলেও মসজিদটিতে নামাজ পড়ে যান। আমি মনে করি, রাবি ক্যাম্পাসের অন্যান্য সব দৃষ্টিনন্দন জায়গার মধ্যে কেন্দ্রীয় মসজিদ অন্যতম।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী মো. জুনায়েদ সোবহান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বাইরের অনেক মানুষও প্রতিনিয়ত এই মসজিদে নামাজ আদায় করতে আসেন। মসজিদটি এর ভিন্নধর্মী স্থাপত্যশৈলীর জন্য বেশ পরিচিত। কারণ এর আগে আমি এ ধরনের স্থাপত্যশৈলীর মসজিদ আর দেখিনি। এছাড়া মসজিদের ইমাম সাহেবের সুন্দর তিলাওয়াত শোনার জন্য এবং তার ইমামতিতে ধীরস্থিরভাবে নামাজ আদায় করার জন্যও অনেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকে এখানে এসে নামাজ আদায় করেন। সব মিলিয়ে এই মসজিদটিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রাণকেন্দ্রও বলা যায়।
মসজিদটিতে বর্তমানে সিনিয়র পেশ ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী মাওলানা ফাহিম মাহমুদ। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি মাদরাসা শিক্ষায়ও পড়াশোনা সম্পন্ন করেছেন।
তিনি বলেন, মসজিদটির ভেতরের অংশ তুর্কি স্থাপত্যশৈলীতে নকশা করা। একসময় মসজিদে জুমার নামাজে খুব ভিড় হতো, যা মুসল্লিদের জন্য কষ্টকর ছিল। তবে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরে বাংলা, বিজয়-২৪ ও মতিহার হলে জুমার নামাজ চালু হওয়ায় মুসল্লিদের চাপ অনেকটাই কমে গেছে।
মসজিদের দুইপাশে নামাজের স্থান সম্প্রসারণের বিষয়ে তিনি বলেন, সম্প্রসারিত নামাজের স্থান মূল মসজিদের সৌন্দর্যে কোনো ব্যাঘাত ফেলবে না বরং দূর থেকে তা দেখতে মসজিদের একটি অংশের মতোই মনে হবে। মূল মসজিদের সঙ্গে সমন্বয় করেই এটি তৈরি করা হচ্ছে।
তবে ঐতিহ্যের এই স্থাপনাটিকে আরও সমৃদ্ধ করার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। মসজিদের পাঠাগারটিকে আরও সমৃদ্ধ করার প্রয়োজন রয়েছে। বইয়ের সংখ্যা বাড়িয়ে পাঠাগারটি উন্নত করার পাশাপাশি অধ্যয়নের জন্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি ও যুগোপযোগী করার দাবি জানিয়েছেন মসজিদের ইমাম।
এদিকে মসজিদের পাঠাগারটি আসরের নামাজের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত খোলা থাকলেও জোহরের নামাজের পর থেকে এশার নামাজের পূর্ব পর্যন্ত খোলা রাখার দাবি জানিয়েছেন মুসল্লিরা।
মসজিদের দু’পাশে নামাজের স্থান সম্প্রসারণের কাজও এগিয়ে চলছে। বর্তমানে মূল মসজিদের দক্ষিণ পাশে নারীদের জন্য আলাদাভাবে মসজিদ নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। একই সঙ্গে মসজিদের উত্তর পাশে পুরুষদের নামাজের স্থান সম্প্রসারণ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।