টাকা দিলেই খুন করেন গলাকাটা মোবারক!

আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০২:৩০ এএম

চট্টগ্রামের রাউজানে যুবদল নেতা মাসুদুল হক হত্যার দায় স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেওয়ার পর এবার ফটিকছড়ি থানার একটি অস্ত্র মামলায় রিমান্ডে থাকা সন্ত্রাসী মুহাম্মদ মোবারক ওরফে ‘গলাকাটা মোবারক’ নিজের অপরাধজগৎ সম্পর্কে পুলিশ কর্মকর্তাদের চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। ২০১৪ সালে ফটিকছড়িতে মো. বাবু নামে এক ব্যক্তিকে গলা কেটে হত্যা করার অভিযোগ ওঠে মোবারকের বিরুদ্ধে। এরপর তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘গলাকাটা মোবারক’ নামে। ফটিকছড়ি থানার অস্ত্র ও পুলিশের ওপর হামলার দুই মামলায় গ্রেপ্তারের গত ২৭ আগস্ট মোবারকসহ চারজনের মোট আট দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন চট্টগ্রামের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত।

গত ২৫ আগস্ট ভোরে ফটিকছড়ির কাঞ্চননগরে একটি বাড়িতে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে গ্রেপ্তার হন মোবারক। পুলিশ মোবারকের কাছে এসএমজি নিয়ে ঘুমানোর একটি ছবি পেয়েছে। এ বিষয়ে মোবারক পুলিশকে জানান, গ্রেপ্তার এড়াতে সব সময় তিনি নাইন এমএম তরাস পিস্তল সঙ্গে রাখতেন। আর হাতের নাগালে রাখতেন অত্যাধুনিক এসএমজি। চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো. তারেক আজিজ বলেন, ‘এসএমজিটি পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হানের কাছে আছে বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছেন মোবারক। এর বাইরেও তার কাছে আরও অস্ত্র আছে। এসব অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান চলছে।’

জেলা পুলিশের আরেক কর্মকর্তা বলেন, ‘১৩ জুন রাউজানে যুবদল নেতা মাসুদুল হক হত্যা, সম্প্রতি ১০ কোটি টাকা চাঁদা না পেয়ে নগরের চন্দনপুরায় শীর্ষ ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানের বাড়িতে এবং এর আগে গত বছরে হাটহাজারী উপজেলার মেখল ইউনিয়নে ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলমের বাড়িতে গুলিবর্ষণের কথা স্বীকার করেছেন মোবারক।’

জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ‘মোবাইলে যুবদল নেতা মাসুদের ছবি পাঠিয়ে টার্গেট ফিক্স করে দিয়েছিল আরেক পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হান আলম। এ ছাড়া নগরীর বায়েজিদ বোস্তামিতে সন্ত্রাসী সরোয়ার বাবলা খুন, নগরের বাকলিয়া এক্সেস রোডে জোড়া খুন, পতেঙ্গায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর খুন এবং চান্দগাঁয়ে বালু ব্যবসায়ী তাহসীন খুন থেকে শুরু করে রাউজান ও ফটিকছড়ির বিভিন্ন হত্যাকান্ডে অংশ নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন মোবারক। তবে যেসব ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজে তাকে দেখা গেছে, এর বাইরেও অন্যান্য হত্যাকান্ডেও মোবারক জড়িত থাকতে পারে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।’     

এদিকে আদালতের একটি সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নগরের কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া নাইন এমএম তরাস পিস্তল দিয়েই মাসুদুল হককে গুলি করে হত্যার দায় স্বীকার করে চট্টগ্রামের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন গলাকাটা মোবারক। জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, মাসুদুল হত্যার ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজে মোবারককে অস্ত্র হাতে দেখা গেছে। তার হাতে ছিল দুটি পিস্তল। মোবারক নিজেই সেই অস্ত্র দিয়ে মাসুদের মাথায় গুলি করেন। গত ২৫ আগস্ট তাকে গ্রেপ্তার অভিযানে গেলে পুলিশকে লক্ষ্য করে একই অস্ত্র দিয়ে ছয়টি গুলি করেন মোবারক।

জেলা পুলিশের দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর ইউনিয়নের হাছি চৌধুরী বাড়ির মো. লোকমানের ছেলে মোবারক। তিনি (মোবারক) একজন ভাড়াটে খুনি। টাকা পেলেই মানুষ খুন করতে দ্বিধা করতেন না। যুবদল নেতা মাসুদুল খুনের জন্য মোবারক পেয়েছিলেন পাঁচ লাখ টাকা। পড়ালেখা জানেন না। একসময় ছিলেন রঙমিস্ত্রির হেলপার। শিবির ক্যাডার হিসেবে পরিচিত ‘সন্ত্রাসী’ নাছির উদ্দিনের হাত ধরে অপরাধজগতে প্রবেশ করেন মোবারক। নাছির কারাগারে যাওয়ার পর (বর্তমানে কারামুক্ত) উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী আবু তৈয়বের সঙ্গে তার যোগাযোগ হয়।

জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, অপরাধ ঘটিয়ে রাউজানের পার্শ^বর্তী পাহাড়ে আত্মগোপনে চলে যেতেন মোবারক। কিছু দিন পর আবারও ফিরে নগর ও জেলার বিভিন্ন স্থানে এসে খুন-খারাবি, চাঁদা না পেয়ে বিভিন্ন ব্যবসায়ীর বাড়িতে গুলিবর্ষণ করতেন। ঘুমানোর সময় হাতের রাখতেন অত্যাধুনিক নাইন এমএম তরাস পিস্তল ও এসএমজির (সাব মেশিনগান)।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের (বর্তমানে কারাগারে) সঙ্গে যুক্ত হন মোবারক। ইমন ও মোবারক দুজনই বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের অনুসারী। ইমনের কাছে অস্ত্র চালানো শিখেছেন তিনি। অস্ত্র পরিচালনায় দক্ষ হিসেবে বড় সাজ্জাদ বাহিনীতে মোবারকের বেশ কদর ছিল। ইমনের চেয়ে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসী মোবারক দুই হাতে গুলি চালাতে পারেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত