লালদিয়াতেই হচ্ছে দেশের প্রথম গ্রিন পোর্ট টার্মিনাল

আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০২:৩১ এএম

পতেঙ্গার লালদিয়াতেই হচ্ছে দেশের প্রথম গ্রিন পোর্ট টার্মিনাল। আজ রবিবার এই টার্মিনাল নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর হতে যাচ্ছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিশেষ অতিথি থাকবেন সড়ক পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। নিজস্ব বিদ্যুৎ শক্তির মাধ্যমে কোনো ধরনের দূষণ না ঘটিয়ে ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগে আধুনিক প্রযুুক্তির এই গ্রিন পোর্ট টার্মিনাল নির্মাণ করছে বিশ^খ্যাত শিপিং কোম্পানি মায়ের্সক গ্রুপের এপি মোলার। ডেনমার্কের প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব অর্থায়নে এটি নির্মাণ করবে এবং প্রতি বছর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে আড়াই লাখ মার্কিন ডলার দেবে। এই টার্মিনালের মাধ্যমে দেশের শিপিং খাত আরও আধুনিক হবে বলে বন্দর ব্যবহারকারীদের অভিমত।

কনসেশন চুক্তি অনুযায়ী, গত বছর চুক্তি স্বাক্ষরের পর প্রথম তিন বছর টার্মিনাল নির্মাণের সময়। নির্মাণের পর ২০৩০ সাল থেকে বাণিজ্যিক অপারেশনে যাবে এটি। আগামী ৩০ বছর এপি মোলারের অধীনে তা পরিচালিত হবে এবং চুক্তির শর্তানুযায়ী বার্ষিক ফি ও কনটেইনার হ্যান্ডলিং চার্জ চট্টগ্রাম বন্দরকে প্রদান করবে। যদি এপি মোলারের কাজ সন্তোষজনক হয়, তবে এই চুক্তির মেয়াদ আরও ১৫ বছর বর্ধিত করা যাবে। সেই আলোকে এপি মোলারকে দেওয়া ৫০ একর ভূমির মধ্যে ৩২ একরে টার্মিনাল, ৮ একরে কনটেইনার ইয়ার্ড ও ১০ একরে ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। এরমধ্যে টার্মিনাল নির্মাণের কাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হবে আজ রবিবার।

জানা গেছে, টার্মিনালটি বছরে ৮ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করবে। এটি সর্বোচ্চ ১০ লাখ পর্যন্তও হতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ একক কনটেইনার নিয়ে জাহাজ ভিড়লেও এই টার্মিনালে ৬ হাজার কনটেইনার নিয়ে ১১ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়তে পারবে। সম্পূর্ণ গ্রিন পোর্ট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাওয়া এই টার্মিনালে সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করা হবে।

এপি মোলারের স্থানীয় এজেন্ট কিউএনএস গ্লোবাল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসফারুল কাইয়ুম খান বলেন, ‘এই টার্মিনাল অপারেশনে রোবোটিক পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে। আধুনিক এই প্রযুক্তি ব্যবহারে সময় যেমন কম লাগবে, তেমনি কাজও নিখুঁত হবে। এ ছাড়া সম্পূর্ণ গ্রিন ইয়ার্ড হবে এই টার্মিনাল। কায়িক শ্রমের তুলনায় কারিগরি পদ্ধতিকে অগ্রাধিকার দিলেও এখানে প্রায় এক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে।’

এই টার্মিনালে সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন বন্দর ব্যবহারকারীরা। চিটাগাং চেম্বার অব কমার্সের সদস্যরা সরাসরি বন্দর ব্যবহারে জড়িত। সংস্থাটির সভাপতি ও ব্যবসায়ী নেতা আমিরুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের এ পর্যন্ত যত উন্নয়ন হয়েছে তা করেছে আমদানিকারক কিংবা রপ্তানিকারকরা। আমরা পণ্য আমদানি বা রপ্তানি করি বলেই কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে বন্দর রেকর্ড করে। এর পুরো অবদান আমাদের। ঠিক তেমনিভাবে এই বন্দরে বিশ^খ্যাত কোম্পানি এপি মোলার বিনিয়োগে এগিয়ে আসায় আপগ্রেড হবে আমাদের শিপিং খাত।

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ ফেরদৌস বলেন, এপি মোলারের মতো প্রতিষ্ঠান যেহেতু গ্রিন ফিল্ডে বিনিয়োগ করে আধুনিক প্রযুক্তির টার্মিনাল নির্মাণ করছে, এর সুবিধাভোগী হবো আমরা। চুক্তির নির্ধারিত সময়ের পর তারা চলে গেলে টার্মিনালটির মালিকানা আমাদের হবে। প্রয়োজনে নতুন চুক্তিতে অন্য যে কেউ পরিচালনা করলেও আমরা লাভবান হবো।

শুধু কি আর্থিক লাভবান? এই প্রশ্নের জবাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলম বলেন, এর মাধ্যমে দেশের মানুষের কর্মসংস্থান যেমন হবে তেমনি শ্রমিকদের দক্ষতাও বাড়বে। মোহনা থেকে কাছে হওয়ায় জোয়ার-ভাটার প্রভাব কম থাকবে এবং বেশি কনটেইনার নিয়ে বড় জাহাজ ভেড়ার সুযোগ পাবে টার্মিনালে।

চট্টগ্রাম বন্দরের ইয়ার্ড থেকে আমদানিকৃত কনটেইনার সরাসরি গ্রহণ ও রপ্তানিপণ্যবাহী কনটেইনার জাহাজীকরণে সরাসরি জড়িত বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোগুলো। বর্তমানে ৬৫ আইটেমের আমদানি পণ্য যেমন এই ডিপোগুলোতে যায় এবং শতভাগ রপ্তানি পণ্য কনটেইনারও এসব ডিপো থেকে জাহাজ যায়। এপি মোলারের কাজ শুরু হওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপোস অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বলেন এই টার্মিনালে বন্দরের কাজের পরিধি বাড়বে। এখন এনসিটি (নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল) ও সিসিটিতে (চিটাগাং কনটেইনার টার্মিনাল) চাপ বেশি পড়ছে। যদিও পিসিটি (পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল) ইদানীং ইক্যুইপ্ট হওয়ার পর চাপ কিছুটা ডাইভার্ট হয়েছে তারপরও কনটেইনারের চাপ রয়েছে। এপি মোলার অপারেশনে এলেই চাপ কমে আসবে।

যেভাবে লালদিয়া বরাদ্দ পায় মায়ের্সক : গত ৪ নভেম্বর এপিএম টার্মিনালের প্রস্তাব দাখিলের পর ৫ নভেম্বর কারিগরি প্রস্তাব মূল্যায়ন হয়। ৬ নভেম্বর আর্থিক প্রস্তাব মূল্যায়নের পর ৯ নভেম্বর বন্দর ও এপিএম টার্মিনালের মধ্যে নেগোশিয়েশন হয়। একই দিনে তা বোর্ড সভায় অনুমোদনের পর ১০ ও ১১ নভেম্বরে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় ও আইন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়া যায়। ১২ নভেম্বর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির সভায় অনুমোদনের সুপারিশের পর ১৬ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টার চূড়ান্ত অনুমোদন পায়। ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও এপি মোলারের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

লালদিয়া কেন এত গুরুত্বপূর্ণ : চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে ৯ দশমিক ৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ ভিড়তে পারে। কিন্তু এ জন্য জাহাজগুলোকে মোহনা থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরত্বে তিনটি বেন্ড (বাঁক) পার হতে হয়। কিন্তু লালদিয়া টার্মিনালটি মোহনা থেকে ৬ কিলোমিটারের মধ্যে এবং এতে প্রাকৃতিকভাবেই গভীরতা প্রায় ১০ মিটার রয়েছে। ড্রেজিং করে তা ১১ মিটারে উন্নীত করা সম্ভব।

লালদিয়ার চরে তিনটি ব্লক রয়েছে। ১৯৩৫ সালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এই তিনটি ব্লক অধিগ্রহণ করেছিল। এরমধ্যে একটি ব্লক (১৩ ও ১৪ নম্বর খালের মধ্যবর্তী জায়গা) ২০০৫ সালের জুলাই মাসে উচ্ছেদ করেছিলেন তৎকালীন চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের ম্যাজিস্ট্রেট মুনীর চৌধুরী। সেই উচ্ছেদকৃত জায়গায় পরবর্তীতে গড়ে তোলা হয়েছে ইনকনট্রেন্ড কনটেইনার টার্মিনাল।

১২ ও ১৩ নম্বর খালের মধ্যবর্তী এবং ১৪ ও ১৫ নম্বর খালের মধ্যবর্তী দুটি জায়গার অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হয়েছিল ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এই উচ্ছেদকৃত জায়গা দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকার পর ২০২৩ সালে এখানে টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব দেয় মায়ের্সক গ্রুপ। নৌবাণিজ্যে বিশে^র দ্বিতীয় শীর্ষ কোম্পানি ডেনমার্কের এপি- মোলার মায়ের্সক গ্রুপ চট্টগ্রাম বন্দরে বিনিয়োগের জন্য দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা করলেও আগে সুযোগ পায়নি। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১২ ও ১৩ নম্বর খালের মধ্যবর্তী জায়গাটি চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়ের কারণে উপযোগী নয় বলে বন্দরের প্রতিবেদনে উঠে আসে। আর এই স্থানটিতে বাঁকের কারণে নদীর প্রশস্ততাও কম। তখন ১৪ ও ১৫ নম্বর খালের মধ্যবর্তী প্রায় ৩২ একর জায়গাটি মায়ের্সক বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টি উঠে আসে এবং এখানেই নির্মিত হতে যাচ্ছে আগামীর আধুনিক কনটেইনার টার্মিনাল। এর পাশে ইনকনট্রেন্ড টার্মিনালের পেছনে দেওয়া হয় ৮ একর এবং ১২ ও ১৩ নম্বর খালের মধ্যবর্তী জায়গা থেকে দেওয়া হয় ১০ একর জায়গা।

উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দর এখন প্রতি বছর গড়ে ৩৪ লাখ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করে। প্রতি বছর তিন থেকে চার লাখ করে কনটেইনারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত