সরকার গঠনের ছয় মাসের মাথায় মন্ত্রিসভায় রদবদল করেছে বিএনপি। এতে ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন গাইবান্ধা থেকে নির্বাচিত মোহাম্মদ শামীম কায়সার লিংকন। শপথ নেওয়ার পরই তার বিরুদ্ধে বিবৃতি দেয় হেফাজত ইসলাম বাংলাদেশ। মাজহাববিরোধী বাংলা-মাজহাবী মতাদর্শে বিশ্বাসী হওয়ায় এবং দেশের প্রচলিত ইসলামি ঐতিহ্যকে অগ্রাহ্য করার অভিযোগ তোলা হয় তার বিরুদ্ধে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, হজ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, বায়তুল মোকাররমের খতিব নিয়োগসহ তাকে নিয়ে হেফাজতে ইসলামের আপত্তির বিষয়ে সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে।
প্রশ্ন : মন্ত্রিসভায় যুক্ত হয়ে নতুন করে সরকারের সঙ্গে পথচলা শুরু করেছেন। কেমন লাগছে?
উত্তর : আমাকে এই পদের জন্য বিবেচনা করায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা। এই দায়িত্বটি যেমন আনন্দের, তেমনি চ্যালেঞ্জরও। মন্ত্রণালয় ছোট হলেও মানুষের ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় এর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব অনেক বেশি।
প্রশ্ন : গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও রংপুর জেলায় বিএনপির ফলাফল প্রত্যাশিত হয়নি। কারণ কী?
উত্তর : চার জেলায় ১৯টি আসনের মধ্যে বিএনপি পেয়েছে মাত্র একটি। বাকি ১৮টির মধ্যে ১৬টি জামায়াতে ইসলামী ও দুটি এনসিপি পেয়েছে। ভরা জোয়ারের সময়েও এই অঞ্চলে বিএনপির এমন ফলাফল কেন হলো, তা অবশ্যই বিশ্লেষণ করা দরকার। সাংগঠনিকভাবে কোথায় ঘাটতি ছিল, সেটিও দেখতে হবে। জনপ্রতিনিধিত্বের দায়িত্ব ও সাংগঠনিক ভিত্তি শক্ত করা পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত।
প্রশ্ন : আপনার মন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জাল হোসাইন কায়কোবাদ দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত ও ত্যাগী নেতা। তার সঙ্গে কাজ করতে কোনো সীমাবদ্ধতা অনুভব করছেন?
উত্তর : আমাদের মন্ত্রী অত্যন্ত পরীক্ষিত, ত্যাগী, নির্যাতিত ও জনপ্রিয় নেতা। তবে শারীরিক অসুস্থতার কারণে স্বাভাবিকভাবেই তিনি আগের মতো সময় দিতে পারছেন না। প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ সময় অফিস করেন, ছুটির দিনেও কাজ করেন। তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে সেই গতিই প্রয়োজন। তার সহযোগী আমাকে দেওয়া হয়েছে।
প্রশ্ন : আপনার নিয়োগ নিয়ে কিছু মহলে আপত্তি আছে। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
উত্তর : কোনো নিয়োগ সবার পছন্দ হবে, এমন নয়। ধর্ম মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম বা আমার অবস্থান সম্পর্কে কারও অস্পষ্ট ধারণা থেকেও আপত্তি তৈরি হতে পারে। আমরা যত কাছাকাছি কাজ করব, ভুল বোঝাবুঝি তত দূর হবে। আমাদেরও ভুলত্রুটি থাকতে পারে, সেগুলো সংশোধন করব। আমি এই চাপকে ইতিবাচকভাবে দেখি। চাপ থাকলে ভুলের সুযোগ কমে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় গঠনমূলক বিরোধিতা প্রয়োজন। জনগণের পছন্দের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়াটাও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্ন : ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আপনার মূল অগ্রাধিকার কী?
উত্তর : ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় শুধু ইসলাম বা কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা মত প্রতিষ্ঠার মন্ত্রণালয় নয়, এটা দেশের সব ধর্ম, মত-পথের মানুষের জন্য। এখানে সব ধর্মের মানুষ সমান সুযোগ পাবে। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য রয়েছে। সেটিকে আরও শক্তিশালী করতে চাই। তবে আমার প্রথম অগ্রাধিকার বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব।
প্রশ্ন : ধর্ম অবমাননার অভিযোগকে কেন্দ্র করে সংখ্যালঘুদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা রয়েছে। এ ধরনের সহিংসতা ঠেকাতে কী করবেন?
উত্তর : কোনো সহিংসতা হঠাৎ তৈরি হয় না। গুজব বা প্রচার কীভাবে ছড়ায়, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। গত এক থেকে দেড় বছরে মব কালচার বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো ঘটনা যাচাইয়ের আগেই মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। মব কালচারের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।
প্রশ্ন : হজ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম ও এজেন্সির প্রতারণা বন্ধে কী উদ্যোগ নিচ্ছেন?
উত্তর : এবার কোনো হাজি বৈষম্য বা এজেন্সির প্রতারণার শিকার হলে তাকে সেবা দেওয়া হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা হয়েছে। গতবার আমরা দায়িত্ব নেওয়ার সময় হজের প্রায় ৭৫ শতাংশ কাজ আগের সরকার করে রেখেছিল। ফলে কিছুটা চাপ ছিল। এবার হজ শেষ হওয়ার দুই-তিন দিনের মধ্যেই পরবর্তী হজের প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। লক্ষ্য হলো হাজিদের লাগেজ ব্যবস্থাপনা উন্নত করা এবং এজেন্সির প্রতারণা বন্ধ করা।
প্রশ্ন : মডেল মসজিদ নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেবেন?
উত্তর : আমি মাত্র কাজ শুরু করেছি। যতটুকু জানি, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের মডেল মসজিদ হস্তান্তরের পর্যায়ে ছিল, তবে কিছু কাজ অসম্পূর্ণ। কাজ বুঝে না নিয়ে হস্তান্তরের সুযোগ নেই।
প্রশ্ন : বায়তুল মোকাররমের খতিব নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবেন কি?
উত্তর : বর্তমানে জাতীয় মসজিদের খতিব একজন প্রথিতযশা ও সর্বজনবিদিত আলেম। তিনি অত্যন্ত সরল ও অনুসরণীয় ব্যক্তি। তবে খতিব নিয়োগের নীতিমালায় কোনো ফাঁকফোকর থাকলে তা অবশ্যই পর্যালোচনা করব।
প্রশ্ন : ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন আছে। সুশাসন নিশ্চিত করবেন কি?
উত্তর : এটি প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি জ্ঞানভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব। তবে পছন্দ-অপছন্দ থাকতেই পারে। নিশ্চিত করব নিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী হচ্ছে এবং কোনো দুর্নীতির সুযোগ থাকছে না।
প্রশ্ন : হেফাজতে ইসলাম আপনার নিয়োগে আপত্তি জানিয়েছে। এর কারণ কী বলে মনে করেন?
উত্তর : আমার নানারা হানাফি মাজহাবের অনুসারী, আর দাদারা আহলে হাদিসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ছোটবেলা থেকেই দুই ধরনের ফিকহি চর্চা দেখেছি। পরে পড়াশোনা করতে গিয়ে বুঝেছি, ইসলামি জ্ঞানচর্চার মধ্যে অনেক বিস্তৃতি আছে। শুধু দুটি বক্তৃতা শুনে ‘আমিই ঠিক, অন্য সবাই ভুল’, এমন ধারণা তৈরি হওয়া উচিত নয়। আমি আরবি, তাজবিদ ও বিভিন্ন ইসলামি বিষয়ে পড়াশোনা করেছি। ২০১৯ সাল থেকে মসজিদে বক্তব্য দেওয়ার অনুমতিও পাই। বিভিন্ন ঘরানার মানুষের সঙ্গে মিশেছি, বিভিন্ন মসজিদে গিয়েছি। এ কারণে হয়তো কারও মনে হয়েছে, আমি কোনো নির্দিষ্ট মতবাদ প্রতিষ্ঠা করতে চাই। আমি সংশ্লিষ্টদের বলেছি, আমি কোনো মতবাদ চাপিয়ে দিতে আসিনি। এটি কথায় নয়, কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করতে চাই।
প্রশ্ন : আলেম-ওলামা এবং বিভিন্ন ধর্ম ও মতের মানুষের প্রতি আপনার বার্তা কী?
উত্তর : আমাকে এমন জায়গায় ফেলবেন না, যেখানে আমাকে বলতে হয় ‘কাদম্বিনী মরিয়া প্রমাণ করিল, কাদম্বিনী মরে নাই।’ আমি সবার চিন্তা ও উদ্বেগকে সম্মান করি। ধর্ম মন্ত্রণালয়ে কোনো মতবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য আসিনি। সব ধর্ম, মত ও পথের মানুষের নিজ নিজ অবস্থান ও স্পেস নিশ্চিত করাই আমাদের দায়িত্ব। আমি কী করতে চাই, সময় ও কর্মকা-ই তা প্রমাণ করবে।
প্রশ্ন : সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
উত্তর : আপনাকেও ধন্যবাদ।