বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) দ্বাদশ আসর ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগের তদন্তে নতুন মোড় এসেছে। তদন্ত শেষে তিন সাবেক বিসিবি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) অ্যান্টি-করাপশন কোডের বিভিন্ন ধারা ভঙ্গের অভিযোগ এনেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। অভিযুক্ত তিনজন হলেন বিসিবির সাবেক পরিচালক ও অডিট কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মুখলেসুর রহমান শামীম, সাবেক সিকিউরিটি লিয়াজোঁ অফিসার (এসএলও) জাকির হোসেন এবং বগুড়া জেলার সাবেক বিসিবি কাউন্সিলর ও অডিট কমিটির সাবেক সদস্য সচিব রাকিবুল ইসলাম সানি।
অভিযোগ আনার পর তিন অভিযুক্তকেই সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করেছে বিসিবি। অভিযোগের নোটিশ পাওয়ার পর ১৪ দিনের মধ্যে তাদের প্রত্যেককে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করে জবাব দিতে হবে। এরপর আইসিসির অ্যান্টি-করাপশন কোড অনুযায়ী পরবর্তী শৃঙ্খলাবিষয়ক প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হবে।
বিসিবির ইন্টিগ্রিটি ইউনিট (আকু) বিপিএলের দ্বাদশ আসরকে ঘিরে কথিত দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ তদন্ত করে। সেই তদন্তের ভিত্তিতেই তিনজনের বিরুদ্ধে আইসিসির অ্যান্টি-করাপশন কোড ফর পার্টিসিপ্যান্টস, ২০২৪-এর বিভিন্ন ধারায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হয়েছে। বিসিবির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তদন্তে ম্যাচের ফল, অগ্রগতি, পরিচালনা বা ম্যাচের অন্য কোনো দিক অনৈতিকভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা, অন্য অংশগ্রহণকারীকে দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা, দুর্নীতির কোনো প্রস্তাব বা আমন্ত্রণের তথ্য কর্তৃপক্ষকে না জানানো এবং অ্যান্টি-করাপশন তদন্তে অসহযোগিতার মতো বিষয় উঠে এসেছে।
তিন অভিযুক্তের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে শামীমের বিরুদ্ধে। সাবেক এই বিসিবি পরিচালক ও অডিট কমিটির চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আইসিসি অ্যান্টি-করাপশন কোডের ২.১.১, ২.১.৪, ২.৪.৪ ও ২.৪.৭ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
২.১.১ ধারায় কোনো ম্যাচের ফল, অগ্রগতি, পরিচালনা কিংবা ম্যাচের অন্য কোনো দিক অনৈতিকভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা বা এ ধরনের প্রচেষ্টায় কোনোভাবে যুক্ত থাকার বিষয়টি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। বিসিবির অভিযোগে বলা হয়েছে, বিপিএলের দ্বাদশ আসরকে কেন্দ্র করে শামীম এই ধারার আওতাভুক্ত কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন বা এমন কর্মকাণ্ডের চেষ্টা করেছেন।
তার বিরুদ্ধে ২.১.৪ ধারায় আরও অভিযোগ রয়েছে। এই ধারায় কোনো অংশগ্রহণকারীকে দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে প্ররোচিত, উৎসাহিত কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে সহায়তা করার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত।
এ ছাড়া দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার কোনো প্রস্তাব বা আমন্ত্রণ পাওয়ার পর সেটির পূর্ণাঙ্গ তথ্য নির্ধারিত অ্যান্টি-করাপশন কর্মকর্তাকে অযথা বিলম্ব না করে জানাতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগও রয়েছে শামীমের বিরুদ্ধে। আইসিসি কোডের ২.৪.৪ ধারায় এই ধরনের তথ্য গোপন বা যথাসময়ে প্রকাশ না করাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি এসেছে ২.৪.৭ ধারায়। এই ধারায় কোনো সম্ভাব্য দুর্নীতির তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, এমন যোগাযোগ বা তথ্য গোপন, মুছে ফেলা বা ধ্বংস করে তদন্তে বাধা দেওয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত।
অন্যদিকে, বিসিবির সাবেক সিকিউরিটি লিয়াজোঁ অফিসার (এসএলও) জাকির হোসেনের বিরুদ্ধে আইসিসি অ্যান্টি-করাপশন কোডের ২.১.১, ২.১.৪ ও ২.৪.৬ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিপিএলের ম্যাচের ফল, অগ্রগতি, পরিচালনা কিংবা ম্যাচের অন্য কোনো দিক অনৈতিকভাবে প্রভাবিত করার চেষ্টা বা এ ধরনের প্রচেষ্টায় যুক্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে কোনো অংশগ্রহণকারীকে দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে প্ররোচিত, উৎসাহিত কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে সহায়তা করার অভিযোগও রয়েছে জাকিরের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া অ্যান্টি-করাপশন কর্মকর্তার পরিচালিত তদন্তে যথার্থ কারণ ছাড়া সহযোগিতা না করা বা সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানানোর অভিযোগ আনা হয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিসিবির তথ্য অনুযায়ী, তদন্তের অংশ হিসেবে জারি করা ডিমান্ড নোটিশ মেনে না চলার বিষয়টিও এই অভিযোগের আওতাভুক্ত।
তৃতীয় অভিযুক্ত রাকিবুল ইসলাম সানি। বগুড়া জেলার সাবেক বিসিবি কাউন্সিলর এবং বিসিবি অডিট কমিটির সাবেক সদস্য সচিব সানির বিরুদ্ধে আইসিসি অ্যান্টি-করাপশন কোডের ২.৪.৪ ও ২.৪.৬ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার কোনো প্রস্তাব বা আমন্ত্রণ পাওয়ার পর সেটির পূর্ণাঙ্গ তথ্য নির্ধারিত অ্যান্টি-করাপশন কর্মকর্তাকে অযথা বিলম্ব না করে জানাতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি সম্ভাব্য দুর্নীতির বিষয়ে পরিচালিত তদন্তে যথার্থ কারণ ছাড়া সহযোগিতা না করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
তবে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনা হলেও এখনো তিনজনের কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, এমন কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি বিসিবি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অভিযুক্তদের জবাব দেওয়ার সুযোগ রয়েছে এবং পরবর্তী প্রক্রিয়ায় তাদের বক্তব্য ও তদন্তসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো বিবেচনা করা হবে।