দুই দেশের সম্পর্কোন্নয়নে তৎপর দীনেশ ত্রিবেদী

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০২ এএম

বাংলাদেশের সঙ্গে প্রায় স্থবির হয়ে যাওয়া সম্পর্কে গতি আনার দায়িত্ব দিয়ে ভারত সরকার ঢাকায় হাইকমিশনার হিসেবে পাঠিয়েছে রাজনীতিক দীনেশ ত্রিবেদীকে। দুই দেশের সরকারপ্রধানদের নির্দেশনা নিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে উন্নত করতে তৎপর রয়েছেন তিনি। টানা বিভিন্ন পর্যায়ে কথা বলে চলেছেন, দুই রাজধানীতেই।

ভারতের শাসক দল বিজেপির প্রবীণ এই নেতা মনে করেন, দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে একটি শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হলে সম্পর্কে গতি আনা সহজ হবে; বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের পথও পাওয়া যাবে। বাংলাদেশের কূটনীতিকদের একটি বড় অংশও এমনটি মনে করেন। তবে এমন বৈঠকের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতে দ্বিপক্ষীয় এবং বহুপক্ষীয় সফরে নয়াদিল্লি যাওয়ার জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কাছ থেকে পৃথক আমন্ত্রণপত্র পৌঁছেছে।

তারেক রহমানের ভারত সফরের অনুকূল পরিবেশ আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে দীনেশ ত্রিবেদী গতকাল বুধবার বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়ে আলোচনা চলমান আছে। এ সফর প্রধানমন্ত্রীর (তারেক রহমান) এখতিয়ার। তবে উভয়পক্ষের সদিচ্ছা জনবান্ধব এবং মানসিকতা জনমুখী হলে ইতিবাচক ফল আসবে। হাইকমিশনার যোগ করেন, তিনি মনে করেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও জনবান্ধব ব্যক্তি।

জাতীয় সংসদ ভবনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ও ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের সঙ্গে গতকাল সাক্ষাতের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে হাইকমিশনার এ মন্তব্য করেন।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে গণঅভ্যুত্থানে ঢাকায় সরকার-পতনের পর তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লি চলে গেলে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে স্থবিরতা দেখা দেয়। এমন প্রেক্ষাপটে ৫৪ বছরের প্রথা ভেঙে ভারত পেশাদার কূটনীতিকের বদলে বিজেপি নেতা দীনেশ ত্রিবেদীকে ঢাকায় হাইকমিশনারের দায়িত্ব দেয়। তিনি গত ২৫ জুন আনুষ্ঠানিকভাবে এ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। গত ১০ আগস্ট তিনি ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেদিনই নয়াদিল্লি উড়ে গিয়ে পরদিন ১১ আগস্ট ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের সঙ্গে বৈঠকে দীনেশ ত্রিবেদী দুই দেশের সংসদ সদস্যদের মধ্যে ‘ফ্রেন্ডশিপ গ্রুপ’ গঠনের প্রস্তাব দেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এই গ্রুপে দুই দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংসদ সদস্যরা দলীয় বিভাজন অতিক্রম করে অংশ নিতে পারবেন।

দুই দেশের সংসদের মধ্যে এ ধরনের যোগাযোগকে ধারাবাহিক প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজনীতি নিজ নিজ পথে চলবে; তবে সংসদ হচ্ছে জনগণের প্রতিনিধিত্বের প্রতিষ্ঠান। সংসদ সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য ভারতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে বলে তিনি জানান।

হাফিজ উদ্দিন আহমদ হাইকমিশনারকে বলেন, দুই দেশের সম্পর্ক সবসময় নানা টানাপড়েনের মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। ঐতিহাসিক এ সম্পর্ক বিভিন্ন সময়ের প্রেক্ষাপটে পরিবর্তিত হয়েছে। শেখ হাসিনার শাসনামলে এ সম্পর্ক শুধু সরকারকেন্দ্রিক ছিল। দুই দেশের জনগণের মধ্যকার সম্পর্ক বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত।

স্পিকার বলেন, বিগত ২০০৮, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণœ করেছে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে পুনরায় গণতন্ত্রের পথযাত্রা সুগম হয়েছে।

দীনেশ ত্রিবেদী স্পিকারকে বলেন, দুই দেশের মধ্যে জনগণকেন্দ্রিক সম্পর্ক নির্মাণে ভারত সরকার আগ্রহী। জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক বিনির্মাণের মাধ্যমে তাদের আকাক্সক্ষা পূরণে দেশটির সরকার কাজ করে যাচ্ছে।

দুটি সাক্ষাতে সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে সংসদ সদস্যদের মধ্যে ‘ফ্রেন্ডশিপ গ্রুপ’ গঠন ছাড়াও সংসদীয় প্রতিনিধিদলের সফর বিনিময়, সংসদীয় কমিটিগুলোর মধ্যে সহযোগিতা, সংসদের কার্যক্রম ডিজিটাইজ করা, রোহিঙ্গা সংকট, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান বিষয়ে মতবিনিময় করা হয়।

সংসদের কার্যক্রম ডিজিটাইজেশনের বিষয়ে হাইকমিশনার সাংবাদিকদের জানান, ভারতে সংসদের লাইব্রেরিসহ সংসদীয় কার্যক্রমের বিপুল পরিমাণ তথ্য ডিজিটালাইজড করা হয়েছে। ফলে সংসদ সদস্যরা স্মার্টফোনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় নথি, অধিবেশনের কার্যসূচি ও পুরনো বক্তব্য সহজেই দেখতে পারেন। কোনো নির্দিষ্ট তারিখ, বিষয় বা ব্যক্তির বক্তব্য খুঁজতে একটি বোতাম চাপলেই তা পাওয়া সম্ভব।

হাইকমিশনারের সাক্ষাতের সময় ডেপুটি স্পিকার বলেন, সংসদীয় কূটনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি হলে তা দুই দেশের জন্য চমৎকার অভিজ্ঞতা বিনিময়ের প্ল্যাটফর্ম হতে পারে।

ভারতের ডেপুটি হাইকমিশনার পবন বাঢ়ে সংসদ ভবনের দুটি বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।

হাইকমিশনার এর আগে ঢাকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর কয়েকজন উপদেষ্টার সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন।

প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর প্রসঙ্গে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি গতকাল বলেন, প্রতিবেশী হিসেবে বাংলাদেশ ভারতকে উপেক্ষা করবে না; ভারতও বাংলাদেশকে উপেক্ষা করে না। তবে স্বাধীন ও সার্বভৌম দুটি দেশের মধ্যে সম্পর্ক হতে হবে মর্যাদা, সম্মান ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের সফর দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর সুবিধাজনক সময়ে হবে, এমনটি উল্লেখ করে তিনি বলেন, কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হলে তা গ্রহণ করা কঠিন হবে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত