আপন আলোয় ভাস্বর আনোয়ারা

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৭ এএম

বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি যুগের অন্যতম উজ্জ্বল ও প্রভাবশালী অভিনেত্রী আনোয়ারা। ১৯৫৪ সালের ১৭ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করা এই গুণী শিল্পী দীর্ঘ ছয় দশকের অভিনয় জীবনে সাড়ে ছয় শতাধিক চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন। নৃত্যশিল্পী হিসেবে শুরু করে মিষ্টি নায়িকা এবং পরবর্তী সময় রুপালি পর্দার আদর্শ মমতাময়ী মা সব চরিত্রেই তিনি অর্জন করেছেন আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ও কিংবদন্তিতুল্য মর্যাদা। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি রেকর্ড আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

শৈশবে অভিনয়ে আসার কোনো পূর্বপরিকল্পনা না থাকলেও নাচের প্রতি তার ছিল অসম্ভব অনুরাগ ও সহজাত প্রতিভা। নাচের প্রতি মেয়ের এই গভীর ভালোবাসা দেখে তার বাবা নিজেই তাকে হারমোনিয়াম ও তবলা কিনে দিয়ে উৎসাহিত করেছিলেন। মঞ্চে নাচ ও নাটকে অভিনয়ের মধ্য দিয়েই সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তার আত্মপ্রকাশ ঘটে। ১৯৬১ সালে অভিনেতা আজিমের হাত ধরে রুপালি পর্দায় পা রাখেন তিনি।

চলচ্চিত্র জীবনের প্রথমভাগে তিনি কাজল, শাদী, বন্ধন, শীত বসন্ত, ১৩ নং ফেকু ওস্তাগার লেন, কাগজের নৌকা ও বেগানার মতো বহু জনপ্রিয় চলচ্চিত্রে সহশিল্পী হিসেবে অভিনয় দক্ষতা প্রদর্শন করেন। এরপর ১৯৬৭ সালে উর্দু চলচ্চিত্র বালার মাধ্যমে তিনি কেন্দ্রীয় নায়িকা হিসেবে অভিষেক লাভ করেন। তবে একই বছর মুক্তিপ্রাপ্ত ঐতিহাসিক কালজয়ী ছবি নবাব সিরাজউদ্দৌলার আলেয়া চরিত্রটি তাকে রাতারাতি তারকাখ্যাতি এনে দেয় এবং তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। পরবর্তী সময় তিনি নায়িকা থেকে চরিত্রাভিনেত্রী হিসেবে রূপান্তর ঘটান এবং শুভদা, রাধাকৃষ্ণ ও গোলাপি এখন ট্রেনের মতো কালজয়ী চলচ্চিত্রে মমতাময়ী মায়ের চরিত্রে অভিনয় করে দেশের দর্শকের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন করে নেন।

হজব্রত পালন এবং মনের মতো চরিত্রের অভাবে জীবনের একপর্যায়ে তিনি দীর্ঘদিন রুপালি পর্দা ও এফডিসি থেকে দূরে অবস্থান করেছিলেন। তবে শিল্পীসত্তা তাকে চিরতরে দূরে থাকতে দেয়নি। দীর্ঘ বিরতির পর তিনি কালাম কায়সার পরিচালিত মা এবং জাহাঙ্গীর আলমের সোনাবন্ধু চলচ্চিত্রের মাধ্যমে পুনরায় ক্যামেরার সামনে ফিরে আসেন। দীর্ঘদিন পর সেটে ফেরা নিয়ে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকলেও সহশিল্পীদের উপস্থিতি এবং পরিচালকের সহযোগিতায় তিনি দ্রুতই চেনা ছন্দে ফিরে যান। ক্যামেরা ও লাইটের সামনে কাজ ছাড়া ঘরে বসে থাকা তার শিল্পীমনের কাছে কখনোই স্বস্তিদায়ক ছিল না।

পর্দার সফল এই শিল্পী বাস্তব জীবনে মাতৃহারা হওয়া এবং স্বামীর প্রয়াণের মতো গভীর ব্যক্তিগত শূন্যতা ও শোক পার করেছেন। বয়সের ভারে এবং নিজের সন্তান-সংসার থাকা সত্ত্বেও মায়ের অনুপস্থিতির যে গভীর বেদনা, তা তার ব্যক্তিজীবনে এক অপূরণীয় ক্ষত হয়ে রয়েছে।

চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো হতাশায় বিশ্বাসী নন আনোয়ারা। তার মতে, ভালো চলচ্চিত্র সবসময়ই তৈরি হয় এবং কাজ না দেখে কোনো নেতিবাচক মন্তব্য করা সমীচীন নয়। নবীন অভিনেতাদের জন্য তার আজীবন চর্চিত মূলমন্ত্র হলো নিয়মিত কাজ ও অভিনয়ের সাধনা বজায় রাখা, সামান্য অর্জনেই আত্মতুষ্টিতে না ভুগে বিনয়ী থাকা এবং শুটিংয়ের আগে চরিত্রের প্রতিটি দিক নিয়ে গভীর প্রস্তুতি গ্রহণ করা।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত