মাটি, মানুষ ও স্বপ্ন

আপডেট : ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০২:২৫ এএম

ভাওয়াল ও মধুপুর গড়ের পাদদেশে ছায়াঘেরা, শান্ত ও সুনিবিড় প্রকৃতির কোলে অজপাড়াগাঁয়ের এক কৃষানির কোল আলোকিত করে সম্ভবত ১৯৭৩ সালের ৭ ডিসেম্বরের প্রভাতে পৃথিবীতে আগমন ঘটে এক নতুন অতিথির যার নাম কৃষক মোহাম্মদ ছানোয়ার হোসেন। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়।

জন্মের পর থেকেই ছানোয়ার দেখেছেন তার কৃষক বাবার শক্ত হাতে কাঠের লাঙ্গল ও কোদাল দিয়ে উর্বর মাটিকে চাষ করে প্রকৃতির সহায়তায় নানান ফসল উৎপাদনের কলাকৌশল। অন্যদিকে মায়ের মমতাময় হাতের পরশে গৃহপালিত পশুপাখির লালন-পালনও তার শৈশবের অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে। অর্থাৎ পৃথিবীতে চোখ মেলার পর থেকেই তিনি প্রত্যক্ষ করেছেন প্রতিকূলতার মাঝেও কৃষক ও কৃষানির কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন এবং সেই ফসল দিয়ে অগণিত প্রাণীর খাদ্য জোগানের আনন্দ।

ছানোয়ারের বাবা অশিক্ষিত কৃষক হলেও ছেলেকে শিক্ষিত করে তোলার ব্যাপারে ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। বাড়ি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার শিক্ষাজীবন শুরু হয়। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর তাকে প্রায় ছয় কিলোমিটার দূরের একটি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো হয়। বাবা নিয়মিত শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন এবং অনুরোধ করতেন ছেলেকে নিজের সন্তানের মতো দেখাশোনা ও কঠোরভাবে শিক্ষাদান করার জন্য। এভাবেই তিনি ১৯৮৮ সালে এসএসসি, ১৯৯০ সালে এইচএসসি এবং ১৯৯২-৯৩ সালে বিএ পাস করেন।

বিএ পাস করার পর তিনি সিলেটের একটি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। প্রায় চার বছর শিক্ষকতা করার পর তিনি শিক্ষকতা পেশা ত্যাগ করে বাড়িতে ফিরে আসেন এবং সরাসরি কৃষিকাজে যুক্ত হন। আধুনিক ও বিজ্ঞানভিত্তিক চাষাবাদের মাধ্যমে তিনি নানান ফসল উৎপাদন করে নিজেকে একজন সফল কৃষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।

নিজ এলাকার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার লক্ষ্যে ২০০০ সালে স্থানীয় জনগণের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠিত হয় সুনামগঞ্জ গারো বাজার পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

মূলত একজন খাঁটি কৃষক হিসেবে ছানোয়ার প্রতিদিন মাটির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক রেখে ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে তার জীবন পরিচালনা করেন। দীর্ঘদিনের কৃষি অভিজ্ঞতা থেকে তিনি উপলব্ধি করেন, কৃষি একটি স্বাধীন পেশা যা নির্মল সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির এক অনন্য উৎস।

শিক্ষকতা এবং সামাজিক বাস্তবতার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, ব্রিটিশ প্রবর্তিত শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটানোর পরিবর্তে তাদের লক্ষ্যহীনভাবে সার্টিফিকেট অর্জন এবং চাকরিনির্ভর জীবনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার প্রত্যয়ে তিনি নিজের পৈত্রিক পাঁচ বিঘা জমি নিঃশর্তভাবে দান করে একটি ব্যতিক্রমধর্মী কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে প্রচলিত শিক্ষার পাশাপাশি সিলেবাসের বাইরে শিক্ষার্থীদের সরাসরি অংশগ্রহণের মাধ্যমে ফসল উৎপাদন, বিপণন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ওপর বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়, যা তাদের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

কৃষিক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি জাতীয় কৃষি পুরস্কারসহ বিভিন্ন সম্মাননা লাভ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক-চ্যানেল আই এগ্রো অ্যাওয়ার্ডসহ আরও অনেক স্বীকৃতি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত